ধর্ম ডেস্ক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম
তালাক ইসলামে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। তাই এ শব্দ উচ্চারণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। তবে কেউ যদি ঘুমন্ত অবস্থায় স্ত্রীকে তালাকের কথা বলে ফেলেন, তাহলে সেই তালাক কি কার্যকর হবে? বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণ করলে এর বিধান কী? এ ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখতে হবে, ব্যক্তি তখন সত্যিই ঘুমন্ত ও অচেতন ছিলেন কি না।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তিন শ্রেণির মানুষ থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে- ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত, নাবালেগ বালেগ হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল ব্যক্তি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩০১৬)
এই হাদিসের ভিত্তিতে ফকিহরা বলেছেন, ঘুমন্ত অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ থেকে বের হওয়া কথার কারণে তালাক কার্যকর হয় না। তাই কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় স্ত্রীকে তালাকের শব্দ বলেন, তাহলে সেই তালাক পতিত হবে না।
প্রখ্যাত তাবেঈ ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে, ‘ঘুমন্ত ব্যক্তির তালাক ধর্তব্য নয়।’ (কিতাবুল আসার: ২/৪৫১, মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ১১৪২৫)
‘ঘুমের ঘোরে’ কথাটি সবসময় পূর্ণ ঘুম বোঝায় না। কেউ যদি এমন গভীর ঘুমে থাকেন যে তিনি কী বলছেন, সে বিষয়ে তাঁর কোনো হুঁশ নেই, তাহলে তিনি ঘুমন্ত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত। তাঁর মুখ থেকে অনিচ্ছায় তালাকের শব্দ বের হলেও তা পতিত হবে না।
অন্যদিকে কেউ যদি আধা-জাগ্রত বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকেন এবং কথার অর্থ বুঝতে পারেন বা নিজের বক্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি তখন কতটা সচেতন ছিলেন, তা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ মুফতিকে বলেই সমাধান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: মা-বাবা আদেশ করলে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায়?
কেউ যদি সত্যিই ঘুমন্ত ও অচেতন অবস্থায় একসঙ্গে তিনবার তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেন, তাহলে ঘুমন্ত ব্যক্তির তালাক পতিত না হওয়ার বিধানই প্রযোজ্য হবে। কারণ তিনি তখন সচেতন অবস্থায় তালাক প্রদান করেননি।
তবে জাগ্রত অবস্থায় একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণের বিধান আলাদা একটি ফিকহি বিষয়। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই ঘুমের মধ্যে বলা তিন তালাকের সঙ্গে জাগ্রত অবস্থায় দেওয়া তিন তালাককে এক করে দেখা ঠিক নয়।
কেউ স্বপ্নে দেখলেন যে তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। ঘুম থেকে উঠে বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে গেলেন। এমন স্বপ্নের কারণে তালাক কার্যকর হয় না। কারণ এটি বাস্তবে জাগ্রত অবস্থায় উচ্চারিত কোনো তালাক নয়।
আরও পড়ুন: তালাক শব্দ উচ্চারণ করাও যে কারণে বিপজ্জনক
কেউ দাবি করলেন, তিনি ঘুমের মধ্যেই তালাকের কথা বলেছেন। অন্যদিকে স্ত্রী বা পরিবারের কেউ মনে করছেন, তিনি তখন জাগ্রত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের মতো করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
তালাকের ক্ষেত্রে উচ্চারিত শব্দ, ঘটনার সময় ব্যক্তির অবস্থা, তিনি ঘুমন্ত ছিলেন নাকি জাগ্রত ছিলেন এবং কথার অর্থ বুঝেছিলেন কি না এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রেক্ষাপটে পুরো বিষয়টি নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য মুফতির কাছে বর্ণনা করে তাঁর কাছ থেকে ফতোয়া নিতে হবে। বিশেষ করে তিন তালাকের মতো গুরুতর বিষয়ে অনুমানের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
ঘুমন্ত অবস্থার তালাকের বিধান জেনে কেউ যেন তালাকের শব্দ নিয়ে অসতর্ক না হন। জাগ্রত অবস্থায় রাগ, অভিমান বা ঝগড়ার সময়ও তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। একইভাবে কোনো জটিলতা তৈরি হলে ‘আমি তো ঘুমের ঘোরে বলেছিলাম’ এমন দাবি করাও যথেষ্ট নয়। প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, তা বিবেচনা করেই শরিয়তি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ৩০১৬, কিতাবুল আসার: ২/৪৫১, মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ১১৪২৫