ধর্ম ডেস্ক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
মক্কা থেকে দূরে বনু সাদের মরুভূমিতে হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারে কাটে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর। তখন হালিমা (রা.)-এর পরিবার ছিল আর্থিক সংকটে। এমন সময় তাঁরা পিতৃহীন শিশু মুহাম্মদ (স.)-কে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।
মুহাম্মদ (স.)-কে গ্রহণ করার পর হালিমা (রা.)-এর পরিবারে নানা কল্যাণের ঘটনা ঘটতে থাকে বলে হাদিসের বর্ণনায় এসেছে। দুধহীন উটনীতে দুধ আসা, দুর্বল বাহনের দ্রুত চলা এবং পশুর দুধ বেড়ে যাওয়ার মতো এসব ঘটনা হালিমা (রা.) নিজেই বর্ণনা করেছেন।
তৎকালীন আরব সমাজে মক্কার অভিজাত পরিবারের শিশুদের মরুভূমির বেদুইন নারীদের কাছে লালন-পালনের জন্য দেওয়ার প্রচলন ছিল। শহরের তুলনায় মরুভূমির নির্মল পরিবেশে শিশুর শারীরিক বিকাশ ভালো হবে এবং তারা বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখবে-এমনটাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের পর বনু সাদের নারীরা মক্কায় এসেছিলেন দুগ্ধপোষ্য শিশু নিতে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হালিমা সাদিয়া (রা.)। কিন্তু মুহাম্মদ (স.) ছিলেন পিতৃহীন; তাই তাঁর অভিভাবকের কাছ থেকে পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে না বলে অন্য নারীরা তাঁকে নিতে আগ্রহী হননি।
সবাই যখন শিশু নিয়ে ফিরছিলেন, হালিমা (রা.) তখনো ছিলেন শূন্যহাতে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই এতিম শিশুটিকেই গ্রহণ করলেন। স্বামী হারিসকে বললেন, এই শিশুকে নিয়ে ফিরব। হয়তো আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তাঁদের কল্যাণ দান করবেন।
আরও পড়ুন: আমেনার কোলে সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী
তখন ছিল দুর্ভিক্ষের সময়। হালিমা (রা.)-এর নিজের শিশুও ক্ষুধায় রাতে কাঁদত। তাঁর নিজের স্তনে পর্যাপ্ত দুধ ছিল না। সঙ্গে থাকা উষ্ট্রীটিরও দুধ ছিল না। এমনকি তাঁদের বাহনটি এত দুর্বল ছিল যে, যাত্রাপথে বারবার কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়ছিল।
কিন্তু মুহাম্মদ (স.)-কে গ্রহণ করার পরই যেন অভাবের সেই চিত্র বদলে গেল।
হালিমা (রা.) বর্ণনা করেন, শিশুটিকে কোলে নিয়ে স্তন মুখে দিতেই দুধে তা পূর্ণ হয়ে গেল। মুহাম্মদ (স.) তৃপ্ত হয়ে দুধ পান করলেন। এরপর তাঁর দুধভাইও তৃপ্ত হলো। দুই শিশু শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।
হালিমার স্বামী উষ্ট্রীর কাছে গিয়ে দেখলেন, তার ওলানও দুধে পূর্ণ। দুধ দোহন করে দুজন পান করলেন। দীর্ঘদিন পর সেদিন রাতে তাঁরা তৃপ্তি নিয়ে ঘুমালেন।
পরদিন মক্কা থেকে বনু সাদের পথে ফেরার সময় আরেকটি বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। যে বাহনটি আসার সময় কাফেলার পেছনে পড়ে যাচ্ছিল, সেটিই এবার সবাইকে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে চলল। কাফেলার নারীরা অবাক হয়ে হালিমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কি সেই বাহন, যা নিয়ে তুমি এসেছিলে?
মুহাম্মদ (স.)-কে নিয়ে হালিমা (রা.) বনু সাদে ফিরে এলেন। সেখানেও তাঁদের জীবনে কল্যাণের ধারা অব্যাহত থাকল।
হালিমার মেষগুলো দিনের বেলা অনুর্বর চারণভূমিতে চরলেও সন্ধ্যায় ফিরে আসত হৃষ্টপুষ্ট হয়ে, ওলান থাকত দুধে ভরা। অথচ একই চারণভূমিতে চরানো অন্যদের মেষগুলো ফিরত ক্ষুধার্ত ও দুধহীন অবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে অন্যরা নিজেদের রাখালদেরও হালিমার মেষগুলোর চারণস্থানের আশপাশে পশু চরাতে বলত। তবু একই ফল পাওয়া যেত না।
এভাবেই কেটে গেল প্রায় দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে শিশু মুহাম্মদ (স.)-এর শারীরিক ও মানসিক বিকাশও সুন্দরভাবে ঘটতে থাকে।
দুই বছর পূর্ণ হলে হালিমা (রা.) তাঁকে তাঁর মা আমিনার কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর প্রতি মায়া এত গভীর হয়ে গিয়েছিল যে, আরও কিছুদিন নিজেদের কাছে রাখার অনুমতি চাইলেন। শেষ পর্যন্ত আমিনা (রা.) রাজি হলেন। মুহাম্মদ (স.) আবার ফিরে গেলেন বনু সাদের সেই ঘরে।
আরও পড়ুন: কেন তিনি ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’
বনু সাদের মরুভূমিতে তাঁর শৈশবের দিনগুলো কেটেছে প্রকৃতির কাছাকাছি। বিশুদ্ধ আরবি ভাষার পরিবেশে বেড়ে ওঠার এই সময় তাঁর ভাষাগত দক্ষতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। কুরাইশ আমাকে জন্ম দিয়েছে এবং বনু সাদ আমাকে লালন করেছে।’ (মুজামুল কাবির: ৫৪৩৭)
এই শান্ত শৈশ্যের মাঝেই একদিন ঘটে যায় বক্ষ বিদারণের ঘটনা।
মুহাম্মদ (স.) তাঁর দুধভাইয়ের সঙ্গে মাঠে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর দুধভাই ছুটে এসে জানায়, সাদা পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি তাঁকে শুইয়ে তাঁর বুক চিরেছে। হালিমা (রা.) ও তাঁর স্বামী দ্রুত সেখানে গিয়ে শিশুটিকে দেখতে পান। ঘটনার পর তাঁরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
এরপর হালিমা (রা.) তাঁকে তাঁর মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই বনু সাদের ঘরে তাঁর শৈশ্যের সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
শৈশবের সেই সম্পর্ক পরবর্তী জীবনেও অটুট ছিল। হালিমা সাদিয়া (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এলে তিনি তাঁকে বিশেষ সম্মান ও মমতার সঙ্গে গ্রহণ করতেন।
ওমর ইবনুস সায়িব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দুধপিতা তাঁর কাছে এলে তিনি নিজের চাদরের একাংশ বিছিয়ে দেন। দুধমাতা ও দুধভাই এলে তাঁদের প্রতিও তিনি একইভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৪৩)
হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর ঘরেই তাঁর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কেটেছিল। অভাবের মধ্যেও তিনি তাঁকে স্নেহ ও যত্নে লালন-পালন করেন। পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আচরণে সেই দুধমায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের প্রকাশ দেখা যায়।
হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এই সম্পর্ক আমাদের শেখায়, শৈশবে যত্ন ও মমতা পাওয়া মানুষের জীবনে কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দুধমা ও দুধপরিবারের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার একটি সুন্দর দৃষ্টান্তও এতে পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ২২৭২; সুনানে আবু দাউদ: ৫১৪৩; মুজামুল কাবির: ৫৪৩৭; তাবাকাত ইবনে সাদ