মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আমেনার কোলে সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

আমেনার কোলে সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী

আরব তখন নানা ধর্মীয় বিভ্রান্তি, গোত্রীয় সংঘাত ও সামাজিক অনাচারে জর্জরিত। মক্কার কাবা, যা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর তাওহিদের স্মৃতিবাহী পবিত্র ঘর, সেখানে একাধিক মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। গোত্র ও বংশের মর্যাদা মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখত। শক্তিশালীদের প্রভাবের কাছে দুর্বলরা অনেক সময় অধিকার হারাত। এমন এক সমাজেই কোরাইশের বনু হাশেম পরিবারে জন্ম নেন মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (স.)।

তবে সেই সমাজে সব ভালো গুণ হারিয়ে যায়নি। সাহস, অতিথিপরায়ণতা, উদারতা, আত্মমর্যাদা ও বাগ্মিতার মতো গুণও আরবদের মধ্যে ছিল। মূল সংকট ছিল বিশ্বাস ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ (স.) সেই সমাজের মানুষকেই এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়বিচার ও উত্তম চরিত্রের দিকে আহ্বান করেন।

জন্মের আগেই পিতৃহারা

মুহাম্মদ (স.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন বনু হাশেমের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব ছিলেন কোরাইশের বনু জুহরা গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।

বিয়ের পর তাঁদের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আবদুল্লাহ ব্যবসায়িক সফরে শামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ফেরার পথে ইয়াসরিবে অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। তখন আমেনা ছিলেন সন্তানসম্ভবা।

অর্থাৎ পৃথিবীতে আসার আগেই পিতাকে হারান মুহাম্মদ (স.)। জন্মের পরও তাঁর জীবনে পিতৃস্নেহের অভাব থেকে যায়। শৈশবেই একের পর এক আপনজনকে হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি।

সেই সোমবারের সকাল

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁর জন্ম যে সোমবার হয়েছিল, তা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত।

আরও পড়ুন: নবীজির শুভাগমনের কিছু অলৌকিক ঘটনা

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

মক্কার সেই সোমবারে জন্ম নিলেন মুহাম্মদ (স.)। দাদা আবদুল মুত্তালিব নাতিকে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। আরবি ভাষায় যার অর্থ প্রশংসিত।

আমেনার ঘরে সেই নবজাতক

জন্মের পর মুহাম্মদ (স.)-এর প্রথম আশ্রয় ছিলেন তাঁর মা আমেনা। পিতৃহারা এই শিশুকে ঘিরেই শুরু হয় তাঁর জীবনের প্রথম অধ্যায়।

নবীজি (স.)-এর জন্মের সময় কিছু অসাধারণ ঘটনার বর্ণনাও বিভিন্ন হাদিস ও সীরাতগ্রন্থে পাওয়া যায়। হজরত ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তাঁর জন্মের সময় আমেনা একটি নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ দৃশ্যমান হয়েছিল। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৮/২২২)

তবে জন্মকালীন অলৌকিক ঘটনাগুলোর বর্ণনা উল্লেখের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, যার সবগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এক নয়। তাই যেসব বর্ণনা প্রমাণিত, সেগুলোকে সেভাবেই এবং যেসব বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা রয়েছে, সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করাই সংগত।

আরও পড়ুন: নবীজির শুভাগমনে সৃষ্টিকুলের আনন্দ

মরুর কোলে শৈশব

তৎকালীন আরবের প্রচলন অনুযায়ী মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুদের অনেক সময় শহরের বাইরে মরু অঞ্চলের দুধমায়ের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠানো হতো। মুহাম্মদ (স.)-কেও বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে পাঠানো হয়।

সেখানেই তাঁর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কাটে। মরুর নির্মল পরিবেশ ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষার আবহে তিনি বেড়ে ওঠেন। হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারে তাঁর আগমনকে ঘিরে বরকতের বিভিন্ন বর্ণনাও সীরাতের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।

ছয় বছরেই মাকে হারালেন

ছয় বছর বয়সে আমেনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিবে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মায়ের মৃত্যুর পর ছোট্ট মুহাম্মদের দায়িত্ব নেন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু দুই বছর পর, আট বছর বয়সে দাদাকেও হারান তিনি। এরপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালিব।

শৈশবের এই বেদনাময় অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর আচরণেও গভীর মানবিকতার প্রকাশ ঘটায়। এতিম ও অসহায় মানুষের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নের শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর এতিম জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দুহা: ৬)

আরও পড়ুন: নবীজির প্রথম সহচরী হজরত খাদিজা (রা.)-এর অনন্য জীবন 

যে শিশু হয়ে উঠলেন ‘আল-আমিন’

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ (স.) সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য মক্কার মানুষের আস্থা অর্জন করেন। নবুয়ত লাভের আগেই তিনি ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্র ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী সময়ে নবুয়তের দায়িত্ব পাওয়ার পরও তাঁর এই চরিত্রই দাওয়াতের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তিনি মানুষকে যে তাওহিদের দিকে আহ্বান করেছিলেন, নিজের জীবনেও তার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে ছিল সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া ও ন্যায়বোধ।

আমেনার কোলের সেই শিশু

আমেনার কোলে আসা সেই শিশুর শৈশব ছিল নানা বেদনায় ঘেরা। জন্মের আগেই পিতাকে হারিয়েছেন, ছয় বছর বয়সে হারিয়েছেন মাকে, এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিবের ছায়াও সরে গেছে। চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে তিনি বড় হয়েছেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের এসব কষ্ট তাঁকে মানুষের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। পরবর্তী সময়ে তিনি এতিমের অধিকার, দরিদ্রের মর্যাদা, প্রতিবেশীর হক, নারীর সম্মান ও দুর্বল মানুষের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)

সেই শিশুর হাত ধরে নতুন পথ

চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। শুরু হয় নবুয়তের দায়িত্ব এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের নতুন অধ্যায়।

তিনি মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান। গোত্র, বংশ ও সম্পদের অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়াকে মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরেন। এতিম, দরিদ্র, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দেন। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া ও ন্যায়বিচারকে মানুষের চরিত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে শিক্ষা দেন।

এভাবেই আমেনার ঘরে জন্ম নেওয়া সেই শিশু পরিণত হলেন আল্লাহর রাসুলে। তাঁর দাওয়াত আরব সমাজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক জীবনে গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে।

যাঁর জীবন সর্বযুগে অনুসরণীয়

মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মের কথা স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর জীবন ও আদর্শকে জানা। তিনি মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন, দুর্বলদের কীভাবে দেখেছেন, বিরোধীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন এবং ক্ষমতা পেয়েও কীভাবে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এসব তাঁর জীবনের শিক্ষার অংশ।

তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব শুধু জন্মের ঘটনায় নয়, তাঁর নবুয়ত, চরিত্র, দাওয়াত ও মানবতার জন্য রেখে যাওয়া আদর্শে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)

আমেনার কোলে যে শিশু জন্মেছিলেন, তাঁর জীবন তাই শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়। একজন মুসলমানের জন্য তাঁর জীবন বিশ্বাস, চরিত্র ও আচরণের অনুসরণীয় আদর্শ।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর