ধর্ম ডেস্ক
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি শব্দ ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’। এর অর্থ- সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
কিন্তু তাঁর এই রহমতের প্রকাশ কোথায়? কেন তাঁকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত বলা হয়েছে? তাঁর জীবন ও শিক্ষার দিকে তাকালে এর উত্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মহানবী (স.) এমন এক সময়ে নবুয়ত লাভ করেন, যখন আরব সমাজে শিরক, গোত্রীয় সংঘাত, জুলুম ও নানা সামাজিক অনাচার বিস্তৃত ছিল। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন। পাশাপাশি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেন।
তিনি বংশ, সম্পদ বা ক্ষমতাকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বানাননি। বিদায় হজের ভাষণেও তিনি মানুষের পারস্পরিক মর্যাদা ও সাম্যের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর দাওয়াত মানুষের বিশ্বাসের পাশাপাশি চরিত্র ও সামাজিক জীবনেও পরিবর্তন আনে।
তাঁর রহমতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তায়েফের ঘটনা। তায়েফবাসীর নির্যাতনে তিনি রক্তাক্ত হন। এরপর পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। (সহিহ বুখারি: ৩২৩১)
আরও পড়ুন: উম্মতের মুক্তির জন্য নবীজির কান্না
মক্কা বিজয়ের দিনও তাঁর হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ ছিল। দীর্ঘ নির্যাতন, বয়কট ও ঘরছাড়া জীবনের পর সেই মক্কাই তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু বিজয়ের মুহূর্তে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে স্থান দেননি। ক্ষমার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, শক্তি অর্জনের পরও মহানুভব থাকা যায়।
উম্মতের কল্যাণ নিয়ে মহানবী (স.)-এর ব্যাকুলতার কথা হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে। তিনি তাঁর ও উম্মতের দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি আগুন থেকে মানুষকে রক্ষা করতে তাদের টেনে ধরছেন, অথচ তারা তাঁর হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে। (সহিহ মুসলিম: ৫৮৫২)
কোরআনেও তাঁর এই দরদের কথা এসেছে, ‘তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী।’ (সুরা তাওবা: ১২৮)
মানুষ যেন দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হতে পারে, সে জন্য তিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেছেন, সৎপথের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। তাঁর দাওয়াতের মধ্যে তাই ছিল মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের গভীর আকাঙ্ক্ষা।
মহানবী (স.) নিজেও এতিম হয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। তাই এতিমদের প্রতি তাঁর মমতা ছিল গভীর। তিনি বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এ দুটির মতো।’ এরপর তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করেন। (সহিহ বুখারি: ৫৩০৪)
আরও পড়ুন: কেয়ামত পর্যন্ত নবীজির দোয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবেন যারা
নারী, কন্যাশিশু, দাস, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। অধীনস্থদের নিজেদের মতো খাবার ও পোশাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, তাদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। (সহিহ বুখারি: ৩০)
সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল, তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েও তাঁর রহমতের প্রকাশ ঘটেছে।
মহানবী (স.)-এর রহমত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহাবিরা জীবজন্তুর প্রতি দয়া করার প্রতিদান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর প্রতি দয়ার মধ্যে সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০০৯)
একবার একটি উটের দুরবস্থা দেখে তিনি তার মালিককে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দেন। তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির ক্ষমা পাওয়ার ঘটনাও তিনি সাহাবিদের জানিয়েছেন।
সৃষ্টির প্রতি দয়া যে একজন মুমিনের চরিত্রের অংশ, তাঁর এসব শিক্ষা তা স্পষ্ট করে।
‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ শুধু একটি পরিচয় নয়, মহানবী (স.)-এর জীবন ও দাওয়াতের একটি গভীর বৈশিষ্ট্য। মানুষকে তাওহিদের পথে ডাকা, শত্রুর প্রতি ক্ষমা, উম্মতের কল্যাণে দরদ, এতিম ও দুর্বলদের অধিকার রক্ষা এবং প্রাণীকুলের প্রতিও দয়া তাঁর জীবনের নানাক্ষেত্রে এই রহমতের প্রকাশ দেখা যায়।
আজকের বিভক্ত ও অশান্ত পৃথিবীতে তাঁর এসব শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রতি ভালোবাসার অর্থ শুধু তাঁর নাম স্মরণ করা নয়, তাঁর দেখানো দয়া, ন্যায়বোধ, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতার পথ নিজের জীবনেও ধারণ করা। কারণ তাঁর জীবনেই রয়েছে সেই রহমতের বাস্তব রূপ, যে রহমতকে আল্লাহ তাআলা সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য ঘোষণা করেছেন।