ধর্ম ডেস্ক
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী উপলক্ষে অনেক মুসলিম পরিবার ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, আলোকসজ্জা করে এবং আনন্দ প্রকাশ করে। এ নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে- নবীজি (স.)-এর জন্ম উপলক্ষে ঘর সাজানো কি ইসলামে বৈধ?
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম বৈধ উপায়ে সীরাত আলোচনা, দরুদ-সালাম ও আনন্দ প্রকাশকে অনুমোদন করেছেন। অন্যদল মনে করেন, নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন সাহাবায়ে কেরাম ও প্রথম যুগের মুসলিমদের আমলে ছিল না। তাই এটিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক নয়।
মিলাদুন্নবী প্রসঙ্গে আলোচিত একটি হাদিস হলো সোমবারের রোজা।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (স.) নিজের জন্মের দিনের কথা স্মরণ করেছেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। তবে তিনি তা করেছেন রোজার মাধ্যমে। ঘর সাজানো, আলোকসজ্জা বা উৎসব আয়োজনের কোনো নির্দেশ এ হাদিসে নেই।
তাই এই হাদিসকে সরাসরি মিলাদ উপলক্ষে ঘর সাজানোর দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
আরও পড়ুন: মিলাদুন্নবী এলে সাহাবিরা কী করতেন
ঘর পরিষ্কার রাখা কিংবা পরিমিত সাজসজ্জা করা মূলত পার্থিব অভ্যাসের বিষয়। ফিকহের স্বীকৃত একটি মূলনীতি হলো, পার্থিব কাজের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হওয়ার স্পষ্ট কারণ না থাকলে তা বৈধতার আওতায় থাকে।
সুতরাং কেউ যদি এ উপলক্ষে ঘর পরিষ্কার করেন বা পরিমিত সাজসজ্জা করেন এবং এটিকে শরিয়তের নির্ধারিত সুন্নাহ, ওয়াজিব কিংবা বিশেষ ইবাদত মনে না করেন, তাহলে শুধু ঘর সাজানোর কারণে তাকে সরাসরি হারামকারী বলা সহজ নয়।
তবে কেউ যদি মনে করেন, মিলাদুন্নবী উপলক্ষে নির্দিষ্টভাবে ঘর সাজানো একটি বিশেষ ধর্মীয় আমল এবং এর জন্য বিশেষ সওয়াব রয়েছে, তাহলে সেই দাবির জন্য শরয়ি দলিল প্রয়োজন। কারণ কোনো সাধারণ অভ্যাসকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আমলে পরিণত করার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য।
হানাফি আলেমদের মধ্যে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দেওবন্দি ধারার আলেমদের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে প্রচলিত মিলাদ ও আলোকসজ্জাকে শরিয়তে প্রমাণিত নয় বলে মনে করেন। তাঁদের আপত্তির অন্যতম কারণ হলো, সাহাবায়ে কেরাম ও প্রথম যুগের মুসলিমদের মধ্যে এ ধরনের আয়োজনের প্রচলন ছিল না।
অন্যদিকে কিছু হানাফি আলেম সীরাত আলোচনা, নবীজি (স.)-এর গুণাবলি বর্ণনা, দরুদ-সালাম ও বৈধ উপায়ে আনন্দ প্রকাশকে অনুমোদন করেছেন। তবে তারাও শরিয়তবিরোধী কাজ, অপচয়, লোক দেখানো এবং এটিকে অপরিহার্য ধর্মীয় রীতি বানানোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
অর্থাৎ মতভেদের জায়গাটি শুধু ‘ঘর সাজানো’ নয়, এর উদ্দেশ্য, বিশ্বাস, পদ্ধতি ও এর সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আরও পড়ুন: রবিউল আউয়াল শুরু, নবীজির ভালোবাসায় যে আমলগুলো করা চাই
মিলাদ উপলক্ষে ঘর সাজানো হোক বা অন্যকোনো সামাজিক আয়োজন, অপচয় ইসলাম সমর্থন করে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা: ২৭)
তাই সাজসজ্জার জন্য সামর্থ্যের বাইরে অর্থ ব্যয় করা, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় করা কিংবা কে কত বেশি সাজাতে পারে এমন প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
একইভাবে লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আয়োজন করাও এড়িয়ে চলতে হবে।
হানাফি ফিকহে অন্য ধর্মের স্বাতন্ত্র্যসূচক ধর্মীয় রীতির অনুকরণ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তাই সাজসজ্জার ধরন এমন হওয়া উচিত নয়, যা অন্যকোনো ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় উৎসবের স্বাতন্ত্র্যসূচক রীতির হুবহু অনুকরণ হয়ে যায়।
একটি বৈধ সামাজিক কাজও যদি অন্য ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় প্রতীকের অনুকরণে পরিণত হয়, তখন বিষয়টির শরয়ি বিধান ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে হবে।
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুসলমানের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ শুধু কোনো একটি দিনের আয়োজন নয়।
তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর চরিত্র গ্রহণ করা, তাঁর শেখানো আমলগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করা, মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা এবং তাঁর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এসবই তাঁর প্রতি ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।
তাই কেউ যদি মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ঘর সাজান, সেটিকে যেন শরিয়তের আবশ্যিক আমল মনে না করেন। অপচয়, লোক দেখানো ও শরিয়তবিরোধী বিষয় থেকেও দূরে থাকেন। আর যারা এ ধরনের আয়োজনকে সমর্থন করেন না, তারাও মতভিন্নতার ক্ষেত্রে শালীনতা ও আদব বজায় রাখেন।
সারকথা হলো, মিলাদুন্নবীতে ঘর সাজানোর বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য হলো- এটিকে ইসলামের আবশ্যিক আমল বা প্রমাণিত সুন্নাহ হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই। আবার ঘর পরিষ্কার করা বা সাধারণ পরিমিত সাজসজ্জাকে এর উদ্দেশ্য ও বিশ্বাস বিবেচনা না করে সরাসরি হারাম বলাও সতর্কতার দাবি রাখে।
সাজসজ্জার সঙ্গে যদি অপচয়, লোক দেখানো, শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ কিংবা অন্য ধর্মের স্বাতন্ত্র্যসূচক ধর্মীয় রীতির অনুকরণ যুক্ত হয়, সেগুলো অবশ্যই বর্জনীয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মিলাদ উপলক্ষে ঘর সাজানোর চেয়ে নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী নিজের জীবন সাজানোই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য।