ইসলামি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। এ মাস এলেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন, আদর্শ ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা বাড়ে। নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়, তাঁর আদর্শ অনুসরণ এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার মধ্যেই এর প্রকৃত প্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি: ১৫; সহিহ মুসলিম: ৪৪)
কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
রবিউল আউয়াল শুরুতে তাই নবীজি (স.)-এর ভালোবাসায় কয়েকটি আমল ও বিষয় মনে রাখা যেতে পারে।
১. সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করা
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা। নামাজ ও ইবাদত থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন, লেনদেন এবং মানুষের সঙ্গে আচরণ- জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা থাকা উচিত।
আরও পড়ুন: রবিউল আউয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদে মিলাদুন্নবী ২৬ আগস্ট
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)
তাই রবিউল আউয়ালকে নবীজি (স.)-এর একটি সুন্নাহ শেখা এবং তা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করার সময় হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
২. নবীজির সিরাত অধ্যয়ন করা
ভালোবাসার স্বাভাবিক দাবি হলো প্রিয় ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে জানা। তাই রবিউল আউয়াল নবীজি (স.)-এর সিরাত অধ্যয়নের একটি সুযোগ হতে পারে।
তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি, মানুষের সঙ্গে আচরণ, পরিবারে তাঁর জীবন, সাহাবিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রামাণ্য সূত্র থেকে জানা দরকার। সন্তান ও পরিবারের সদস্যদেরও তাঁর জীবন ও আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করা যেতে পারে।
সিরাত অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এতে নবীজি (স.)-এর জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি হবে এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের আগ্রহ বাড়বে।
৩. বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম আমল হলো তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে মুমিনরা, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা আহজাব: ৫৬)
আরও পড়ুন: ১২ রবিউল আউয়াল কি রোজা রাখা সুন্নত?
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নবীজি (স.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন। (সুনান নাসায়ি: ১২৯৭)
তাই রবিউল আউয়ালসহ বছরের প্রতিটি সময় নবীজি (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠের অভ্যাস করা যেতে পারে।
৪. নবীজির চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করা
নবীজি (স.)-এর জীবন ছিল উত্তম চরিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমা, বিনয়, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তাই নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি বড় মাধ্যম হলো এসব গুণ নিজের জীবনে আনার চেষ্টা করা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, মানুষের অধিকার রক্ষা, এতিম-গরিবদের সহযোগিতা এবং লেনদেনে সততা এসবের মধ্যেও নবীজি (স.)-এর আদর্শ অনুসরণের প্রকাশ ঘটে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
তাঁর রহমতের আদর্শ অনুসরণ করে মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও সদাচরণ করাও নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
আরও পড়ুন: রবিউল আউয়াল: বেশি বেশি দরুদ পড়ার বিস্ময়কর প্রতিদান
৫. ভালোবাসার নামে প্রমাণহীন আমল থেকে বিরত থাকা
রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কোনো আমল বা ইবাদতকে বিশেষভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়, যার শরিয়তে প্রমাণ নেই। কোরআন-সুন্নাহয় রবিউল আউয়াল মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ইবাদত নির্ধারণ করা হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সংযোজন করে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭)
তাই নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে এমন কোনো আমলকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করা উচিত নয়, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।
উদাহরণ হিসেবে, নবীজি (স.) সোমবার রোজা রাখতেন এবং এ দিন তাঁর জন্ম ও ওহি নাজিলের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে। (সহিহ মুসলিম) তবে এই সুন্নাহকে রবিউল আউয়ালের নির্দিষ্ট কোনো দিনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া ঠিক নয়।
ভালোবাসা হোক জীবনের পরিবর্তনে
রবিউল আউয়াল নবীজি (স.)-এর জীবন ও আদর্শ নতুন করে জানার একটি সুযোগ। তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুন্দর পথ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, সিরাত অধ্যয়ন, বেশি বেশি দরুদ পাঠ এবং তাঁর উত্তম চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করা।
ভালোবাসা যেন শুধু আলোচনা, আবেগ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমা, মানুষের হক আদায় এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার প্রভাব জীবনে ফুটে উঠুক। রবিউল আউয়াল হোক নবীজি (স.)-এর জীবন ও আদর্শ নতুন করে জানার, সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করার এবং নিজের চরিত্র ও আমল সংশোধনের সময়।
সূত্র: সুরা আলে ইমরান: ৩১; সুরা আহজাব: ২১, ৫৬; সুরা আম্বিয়া: ১০৭; সহিহ বুখারি: ১৫, ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ৪৪; সুনান নাসায়ি: ১২৯৭




