Dhaka Mail Logo

ইসলাম

শত বছর আগে মুসলিম নারীরা যেভাবে গাড়ি চালাতেন

ধর্ম ডেস্ক

১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

আজ রাস্তায় গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে নারীদের দেখা খুবই স্বাভাবিক। অফিসে যাওয়া, সন্তানকে স্কুলে নেওয়া, বাজার করা কিংবা নিজের প্রয়োজনে কোথাও যাওয়া- অনেক নারীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে গাড়ি চালানো।

কিন্তু মুসলিম নারীর হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং কি একেবারেই আধুনিক সময়ের ঘটনা?

ইতিহাসের দিকে তাকালে উত্তরটি কিছুটা চমকে দেওয়ার মতো।

প্রায় এক শতাব্দী আগে, যখন মোটরগাড়ি ছিল আধুনিক বিশ্বের নতুন এক বিস্ময়, তখনই মিসরের এক নারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নিয়েছিলেন। তাঁর নাম আব্বাসিয়া আহমেদ ফারগালি।

১৯২০ সালেই হাতে উঠেছিল লাইসেন্স

আব্বাসিয়া ফারগালি মিসরের আসিউত প্রদেশের আবু তিগে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি ইউরোপে যান। ১৯২০ সালের ২৪ জুলাই ফ্রান্সে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স পান। এরপর ১৯২৮ সালে মিসরেও তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স নেন।

মিসরীয় ঐতিহাসিক সূত্রগুলো তাঁকে প্রথম দিকের নারী চালকদের একজন এবং মিসরের প্রথম নারী চালক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সময়টা একবার ভাবুন। আজকের মতো ব্যস্ত সড়ক তখন ছিল না। মোটরগাড়িও সাধারণ মানুষের পরিচিত বাহন হয়ে ওঠেনি। সেই সময় একজন মুসলিম নারী নিজেই স্টিয়ারিংয়ে বসেছিলেন।

তবে তাঁকে ‘প্রথম মুসলিম নারী’ বা ‘প্রথম আরব নারী’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো। সে সময়ের পুরো মুসলিম বিশ্বের নারী চালকদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক নথি একসঙ্গে পাওয়া যায় না। তাই তাঁকে প্রথম দিকের এবং মিসরের প্রথম নারী গাড়িচালক হিসেবে পরিচিত বলা বেশি নিরাপদ।

আরও পড়ুন: মুসলিম নারীর কর্মজীবন: সাহাবিয়াতদের আদর্শ ও আধুনিক বাস্তবতা

গাড়ির আগে উটের পিঠে

নারীর বাহনে চলাচলের ইতিহাস অবশ্য গাড়ির চেয়েও অনেক পুরোনো। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে নারীরা উটসহ তৎকালীন বিভিন্ন বাহনে চলাচল করতেন। এ বিষয়ে সহিহ হাদিসও রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘উষ্ট্রারোহী নারীদের মধ্যে কুরাইশের নেক নারীরা উত্তম। তারা শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল এবং স্বামীর মর্যাদার উত্তম রক্ষাকারিণী।’ (সহিহ বুখারি: ৫০৮২)

অর্থাৎ নারীর বাহনে চড়ে চলাফেরা ইসলামের ইতিহাসে নতুন কোনো বিষয় নয়। তখন বাহন ছিল উট। সময়ের সঙ্গে সেই জায়গা নিয়েছে আধুনিক যানবাহন। বাহন বদলেছে। প্রয়োজন বদলায়নি।

বাংলাদেশেও পথটা নতুন নয়

বাংলাদেশেও নারী গাড়িচালকের পথচলা কয়েক দশকের পুরোনো।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্যোগে নারীদের পেশাদার চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ছালেহা বেগম ১৯৮৬ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নারী পেশাদার চালক প্রশিক্ষণ শেষ করেন। পরে তিনি বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী চালক হিসেবে পরিচিতি পান।

জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইএসসিএপি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছালেহা বেগম ১৯৮৪ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী চালক হিসেবে স্বীকৃতি পান।

তথ্যসূত্রে প্রশিক্ষণের সাল ও স্বীকৃতির সময় নিয়ে কিছু পার্থক্য থাকলেও, একটি বিষয় পরিষ্কার- বাংলাদেশে নারীর গাড়ি চালানোর পথচলা আজকের নয়।

আজ যে দৃশ্যকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি, তার পেছনে কয়েক দশকের পথচলা রয়েছে।

আরও পড়ুন: নারীর যে গুনাহের দায় স্বামীর 

তাহলে নারী গাড়ি চালাতে পারবেন?

এখানেই আসে মূল প্রশ্ন। মোটরগাড়ি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে ছিল না। তাই নারীর গাড়ি চালানো নিয়ে কোরআন-হাদিসে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায় না।

ইসলামি ফিকহের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, কোনো কাজকে হারাম বলার জন্য শরিয়তে নিষেধাজ্ঞার দলিল প্রয়োজন। শুধু নতুন বা আধুনিক কোনো বিষয় হওয়ার কারণে সেটিকে নিষিদ্ধ বলা যায় না।

কাতারের আওকাফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘ইসলামওয়েব’-এর একটি ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, মূলত নারীর গাড়ি চালানো বৈধ। তবে এর সঙ্গে শরিয়তের অন্য কোনো নিষিদ্ধ বিষয় যুক্ত হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

অর্থাৎ গাড়ি চালানো নিজে নারীর জন্য নিষিদ্ধ নয়। তবে গাড়ি চালানোর সময় পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা, নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা এবং শরিয়তের অন্যান্য বিধান মেনে চলা জরুরি।

শহরের যাতায়াত আর সফর এক নয়

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শহরের ভেতরে স্বাভাবিক যাতায়াত আর শরিয়তের পরিভাষায় ‘সফর’ এক বিষয় নয়। কোনো যাত্রা শরিয়তসম্মত সফরের পর্যায়ে পড়লে তখন সফরসংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।’ (সহিহ মুসলিম)

সফরের দূরত্ব নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট কোনো কিলোমিটারকে সর্বসম্মত ইসলামি সীমা হিসেবে তুলে ধরা ঠিক নয়। শহরের স্বাভাবিক যাতায়াত এবং দূরপাল্লার সফরকে একই বিধানের আওতায় দেখাও ঠিক হবে না।

আরও পড়ুন: মুমিন নারীর ৭টি মূল্যবান গুণ

পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনতার বিষয়ও আছে

নারীর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে নির্জনতা।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ, তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (জামে তিরমিজি: ২১৬৫)

তাই নারী নিজে গাড়ি চালাচ্ছেন- এটি এক বিষয়। গাড়ি চালানোর সঙ্গে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ, সেটি আলাদা বিষয়।

চলাফেরায় শালীনতাও জরুরি

নারীর বাইরে বের হওয়া ও চলাফেরার ক্ষেত্রে ইসলামে শালীনতা ও পর্দার নির্দেশ রয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।’ (সুরা আআহজাব: ৫৯)

তাই গাড়ি চালানো বৈধ হলেও চলাফেরার অন্য ইসলামি বিধানগুলো থেকে ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। পোশাক, শালীনতা, নিরাপত্তা ও যাত্রার পরিবেশ- সব ক্ষেত্রেই ইসলামের সাধারণ নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

স্টিয়ারিংয়ে নারীর পথচলা নতুন নয়

১৯২০ সালে ফ্রান্সে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া আব্বাসিয়া ফারগালি থেকে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে পেশাদার নারী চালক হিসেবে উঠে আসা ছালেহা বেগম দুটি ঘটনা দুই দেশ ও দুই সময়ের।

তবু দুটির মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট। নারীর হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং নতুন কোনো ঘটনা নয়।

বাংলাদেশেও এই পথচলা কয়েক দশক ধরে এগিয়ে এসেছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্যোগের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারীকে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ইএসকাপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ২ হাজার ৬৯৮ নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

একসময় যে দৃশ্য ছিল বিরল, আজ সেটিই অনেকের কাছে স্বাভাবিক।

ইসলামের দৃষ্টিতেও বিষয়টির মূল কথা পরিষ্কার- গাড়ি চালানো নিজে নিষিদ্ধ নয়। তবে এর সঙ্গে কোনো নিষিদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হলে সেই বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তাই প্রশ্নটি শুধু ‘নারী গাড়ি চালাবেন কি না’ এতটুকু নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে যাচ্ছেন এবং সেই চলাচলের সঙ্গে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হচ্ছে কি না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম নারীর হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং আজকের কোনো ঘটনা নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগেই একজন মুসলিম নারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স হাতে নিয়েছিলেন। আজকের নারীর হাতে যে স্টিয়ারিং, তার গল্পের শুরুটা আসলে আরও অনেক আগে।