মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ সামর্থ্য ও অবস্থান থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রেখে আসছে। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে মানবিক মর্যাদা ও আমলের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো মৌলিক বৈষম্য নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।’ (সুরা হুজরাত: ১৩)
তবে ইসলাম দায়িত্ব, স্বভাব ও প্রয়োজনের ভিন্নতাকে বিবেচনায় রেখে কর্মক্ষেত্রের একটি সুষম ও বাস্তবধর্মী কাঠামো প্রদান করেছে।
বিজ্ঞাপন
সাহাবিয়াতদের জীবনে কর্মতৎপরতা
ইসলামের সোনালি যুগে নারী সাহাবিরা শরিয়তের সীমারেখা বজায় রেখে বিভিন্ন পেশায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, যা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
১. ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম: উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম সফল ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসায়ী। (সিরাত ইবনে হিশাম: ১/১৮৮)। এছাড়া সাহাবিয়াত হজরত খাওলা (আল-হাওলা) বিনতে তুয়াইত (রা.) অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবসা পরিচালনা করতেন। (আল-ইসাবা: ৭/৫৬৬)
২. চিকিৎসা ও সেবামূলক কাজ: হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন যুদ্ধে যেতেন তখন উম্মে সুলাইম (রা.) ও আনসার নারীদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন; তারা পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার: ১৮১০)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: যে নারীর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেছেন নবীজি
নবীজির সাহাবি হজরত উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমি তাদের সরঞ্জামাদি দেখাশোনা করতাম, খাবার প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা করতাম। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার: ১৮১২)
৩. প্রশাসনিক দায়িত্ব: খলিফা হজরত ওমর (রা.) তাঁর শাসনামলে হজরত শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)-কে মদিনার বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক বাণিজ্যিক বিষয় পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করেন। (আল-ইসতিআব: ৪/৩৩২)
৪. কৃষি ও শ্রম: হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) কৃষিকাজ ও পশুপালনের মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে পরিবারকে সহায়তা করতেন। (সহিহ বুখারি: ৫২২৪)
উম্মুল মুমিনীন জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) হাতের কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন এবং সেই অর্থে প্রচুর দান-সদকা করতেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবু ফাজায়েলিস সাহাবা, বাবু ফাজায়েলি জায়নাব বিনতে জাহশ (রা.): ২৪৪২)
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা.) স্ত্রী রায়েতা (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তিনি হাতের কাজ কাজ করে উপার্জন করতেন এবং সেই আয় থেকে স্বামী ও সন্তানদের ভরণপোষণ করতেন। (মুসনাদে আহমদ: ৩৬৫৫)
আরও পড়ুন: নবীজির দাম্পত্য দর্শন: সুখী পরিবারের সোনালি নীতি
গৃহকেন্দ্রিক জীবন ও শ্রমের মর্যাদা
ইসলাম পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং নারীর গৃহকেন্দ্রিক ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য পারিবারিক শৃঙ্খলা ও পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিক গঠন নিশ্চিত করা। এ প্রসঙ্গে কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আর তোমরা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং পূর্ববর্তী জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব: ৩৩)
আধুনিক বস্তুবাদী সমাজে গৃহস্থালি কাজকে অনেক সময় ‘অনুৎপাদনশীল’ মনে করা হলেও ইসলাম একে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মনে করে। নারীর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইসলাম পুরুষের ওপর নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করেছে। আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি কোনো আমলকারীর শ্রমফল নষ্ট করি না- সে পুরুষ হোক বা নারী।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯৫)
প্রয়োজনে বাইরের কর্মজীবন ও ইসলামের শর্তাবলি
ইসলাম বাস্তবতাবিরোধী কোনো জীবনব্যবস্থা নয়। পারিবারিক বা সামাজিক প্রয়োজনে নারীর বাইরে কাজ করার বিষয়টি শরিয়ত সর্বাংশে নিষিদ্ধ করেনি। ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহদের মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু শর্তসাপেক্ষে নারীরা বাইরে কাজ করতে পারেন-
১. বিশেষায়িত পেশা: যেমন নারীদের চিকিৎসাসেবা, ধাত্রীবিদ্যা ও নারী শিক্ষা; যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি অপরিহার্য।
২. পর্দা ও শালীনতা: কর্মক্ষেত্রে পোশাক ও আচরণের শালীনতা বজায় রাখা এবং পুরুষের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান (খালওয়াত) থেকে বিরত থাকা।
৩. পারিবারিক ভারসাম্য: কর্মজীবন যেন মাতৃত্বের মহান দায়িত্ব ও পারিবারিক শান্তিতে বিঘ্ন না ঘটায়।
৪. নিরাপদ পরিবেশ: কর্মস্থল ও যাতায়াত ব্যবস্থা নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার অনুকূল হওয়া।
আধুনিক যুগে বিকল্প কর্মসংস্থান
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মুসলিম নারীদের জন্য ঘরে বসেই পর্দা রক্ষা করে সম্মানজনক উপার্জনের অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেমন-
ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেক্টর: ঘরে বসেই ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক কাজ করা।
ই-কমার্স ও অনলাইন উদ্যোক্তা: ফেসবুক বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচা।
অনলাইন পাঠদান: ধর্মীয় বা জাগতিক শিক্ষা প্রদান।
লেখালেখি ও কনটেন্ট রচনা: গবেষণাভিত্তিক লেখালেখি, অনুবাদ ও সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরির কাজ।
ইসলাম নারীকে কেবল ভোক্তা হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল উৎপাদক ও সমাজ গঠনের অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়। সাহাবিয়াতদের আদর্শ প্রমাণ করে- শরিয়তের বিধান রক্ষা করে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। অতএব, পর্দা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে নীতিনিষ্ঠ কর্মজীবন ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল বৈধই নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

