সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

মুসলিম নারীর কর্মজীবন: সাহাবিয়াতদের আদর্শ ও আধুনিক বাস্তবতা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

মুসলিম নারীর কর্মজীবন: সাহাবিয়াতদের আদর্শ ও আধুনিক বাস্তবতা
ছবি: এআই

মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজ নিজ সামর্থ্য ও অবস্থান থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রেখে আসছে। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে মানবিক মর্যাদা ও আমলের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো মৌলিক বৈষম্য নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।’ (সুরা হুজরাত: ১৩)

তবে ইসলাম দায়িত্ব, স্বভাব ও প্রয়োজনের ভিন্নতাকে বিবেচনায় রেখে কর্মক্ষেত্রের একটি সুষম ও বাস্তবধর্মী কাঠামো প্রদান করেছে।


বিজ্ঞাপন


সাহাবিয়াতদের জীবনে কর্মতৎপরতা

ইসলামের সোনালি যুগে নারী সাহাবিরা শরিয়তের সীমারেখা বজায় রেখে বিভিন্ন পেশায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, যা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

১. ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম: উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম সফল ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসায়ী। (সিরাত ইবনে হিশাম: ১/১৮৮)। এছাড়া সাহাবিয়াত হজরত খাওলা (আল-হাওলা) বিনতে তুয়াইত (রা.) অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবসা পরিচালনা করতেন। (আল-ইসাবা: ৭/৫৬৬)

২. চিকিৎসা ও সেবামূলক কাজ: হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন যুদ্ধে যেতেন তখন উম্মে সুলাইম (রা.) ও আনসার নারীদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন; তারা পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার: ১৮১০)


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: যে নারীর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেছেন নবীজি

নবীজির সাহাবি হজরত উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমি তাদের সরঞ্জামাদি দেখাশোনা করতাম, খাবার প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা করতাম। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার: ১৮১২)

৩. প্রশাসনিক দায়িত্ব: খলিফা হজরত ওমর (রা.) তাঁর শাসনামলে হজরত শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.)-কে মদিনার বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক বাণিজ্যিক বিষয় পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করেন। (আল-ইসতিআব: ৪/৩৩২)

৪. কৃষি ও শ্রম: হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) কৃষিকাজ ও পশুপালনের মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে পরিবারকে সহায়তা করতেন। (সহিহ বুখারি: ৫২২৪)

উম্মুল মুমিনীন জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.) হাতের কাজ করে অর্থ উপার্জন করতেন এবং সেই অর্থে প্রচুর দান-সদকা করতেন। (সহিহ মুসলিম, কিতাবু ফাজায়েলিস সাহাবা, বাবু ফাজায়েলি জায়নাব বিনতে জাহশ (রা.): ২৪৪২)

এ ছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা.) স্ত্রী রায়েতা (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তিনি হাতের কাজ কাজ করে উপার্জন করতেন এবং সেই আয় থেকে স্বামী ও সন্তানদের ভরণপোষণ করতেন। (মুসনাদে আহমদ: ৩৬৫৫)

আরও পড়ুন: নবীজির দাম্পত্য দর্শন: সুখী পরিবারের সোনালি নীতি

গৃহকেন্দ্রিক জীবন ও শ্রমের মর্যাদা

ইসলাম পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং নারীর গৃহকেন্দ্রিক ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য পারিবারিক শৃঙ্খলা ও পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিক গঠন নিশ্চিত করা। এ প্রসঙ্গে কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আর তোমরা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং পূর্ববর্তী জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব: ৩৩)

আধুনিক বস্তুবাদী সমাজে গৃহস্থালি কাজকে অনেক সময় ‘অনুৎপাদনশীল’ মনে করা হলেও ইসলাম একে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মনে করে। নারীর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইসলাম পুরুষের ওপর নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করেছে। আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি কোনো আমলকারীর শ্রমফল নষ্ট করি না- সে পুরুষ হোক বা নারী।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯৫)

প্রয়োজনে বাইরের কর্মজীবন ও ইসলামের শর্তাবলি

ইসলাম বাস্তবতাবিরোধী কোনো জীবনব্যবস্থা নয়। পারিবারিক বা সামাজিক প্রয়োজনে নারীর বাইরে কাজ করার বিষয়টি শরিয়ত সর্বাংশে নিষিদ্ধ করেনি। ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহদের মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু শর্তসাপেক্ষে নারীরা বাইরে কাজ করতে পারেন-

১. বিশেষায়িত পেশা: যেমন নারীদের চিকিৎসাসেবা, ধাত্রীবিদ্যা ও নারী শিক্ষা; যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি অপরিহার্য।
২. পর্দা ও শালীনতা: কর্মক্ষেত্রে পোশাক ও আচরণের শালীনতা বজায় রাখা এবং পুরুষের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান (খালওয়াত) থেকে বিরত থাকা।
৩. পারিবারিক ভারসাম্য: কর্মজীবন যেন মাতৃত্বের মহান দায়িত্ব ও পারিবারিক শান্তিতে বিঘ্ন না ঘটায়।
৪. নিরাপদ পরিবেশ: কর্মস্থল ও যাতায়াত ব্যবস্থা নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার অনুকূল হওয়া।

আধুনিক যুগে বিকল্প কর্মসংস্থান

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মুসলিম নারীদের জন্য ঘরে বসেই পর্দা রক্ষা করে সম্মানজনক উপার্জনের অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেমন-

ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেক্টর: ঘরে বসেই ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক কাজ করা।

ই-কমার্স ও অনলাইন উদ্যোক্তা: ফেসবুক বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচা।

অনলাইন পাঠদান: ধর্মীয় বা জাগতিক শিক্ষা প্রদান।

লেখালেখি ও কনটেন্ট রচনা: গবেষণাভিত্তিক লেখালেখি, অনুবাদ ও সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরির কাজ।

ইসলাম নারীকে কেবল ভোক্তা হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল উৎপাদক ও সমাজ গঠনের অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়। সাহাবিয়াতদের আদর্শ প্রমাণ করে- শরিয়তের বিধান রক্ষা করে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। অতএব, পর্দা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে নীতিনিষ্ঠ কর্মজীবন ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল বৈধই নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর