ধর্ম ডেস্ক
১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
ঘরের বরকত মানেই বেশি টাকা-পয়সা নয়। পরিবারের শান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা, সুস্থতা, হালাল রিজিক, নেক সন্তান এবং অল্পে তৃপ্ত থাকাও বরকতের অংশ।
অনেকের আয় ভালো। তবু সংসারে স্বস্তি নেই। প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। কারও আবার অর্থ আছে, কিন্তু শান্তি নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের কল্যাণ ও বরকতের সঙ্গে তার ঈমান, আমল, উপার্জন ও আচরণের সম্পর্ক রয়েছে।
কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু বিষয় থেকে সতর্ক করা হয়েছে, যা বরকত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আলেমরা চিহ্নিত করেছেন। ঘরের পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ে। সেসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো-
মুমিনের ঘর আল্লাহর স্মরণে প্রাণবন্ত থাকা উচিত। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে ঘরে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি হয়।
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে তার প্রতিপালকের জিকির করে, আর যে জিকির করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)
হাদিসটি মূলত আল্লাহর জিকিরকারীর সঙ্গে জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তির পার্থক্য বোঝাতে বলা হয়েছে। এর আলোকে ঘরেও আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের চর্চা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘরকে শুধু থাকা-খাওয়ার স্থান হিসেবে না দেখে নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে ইবাদতের আবহে গড়ে তোলা উচিত।
আরও পড়ুন: আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় ৪ জিকির
পরিবারের ভরণপোষণের অর্থ হালাল হওয়া ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা কিংবা অন্যকোনো হারাম পথে অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসার চললেও তাতে বরকত আশা করা যায় না।
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
তাই আয়-রোজগারের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। সন্দেহজনক উপার্জন থেকেও দূরে থাকা উচিত।
ঈমান ও তাকওয়া জীবনে বরকতের অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আরাফ: ৯৬)
পরিবারের কেউ গুনাহে জড়িয়ে পড়লে অন্যদেরও নিজেদের আমলের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। ভুল হলে তওবা-ইস্তেগফার করা এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার চেষ্টা করা মুমিনের দায়িত্ব।
আরও পড়ুন: গুনাহের পর অনুতপ্ত মনে ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলত
রাগ, অভিমান বা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা ইসলামে সমর্থিত নয়। সম্পর্ক রক্ষার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
তাই মনোমালিন্য হলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে তা ঠিক করার চেষ্টা করা উচিত। এতে পারিবারিক বন্ধনও অটুট থাকে।
পরিবার, সন্তান, সুস্থতা, নিরাপত্তা, খাবার ও উপার্জন সবই আল্লাহর নেয়ামত। অথচ এসব পেয়েও মানুষ অনেক সময় না-পাওয়ার হিসাব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
তাই পাওয়া নেয়ামতগুলো স্মরণ করা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা মুমিনের স্বভাব হওয়া উচিত।
পরিবারের রিজিক যদি ব্যবসা-বাণিজ্য বা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হয়, সেখানে সততা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, মিথ্যা বলা বা ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়া বেচাকেনার বরকত নষ্ট করে।
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তারা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের ত্রুটি স্পষ্ট করে, তাহলে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হবে। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং ত্রুটি গোপন করে, তাদের বেচাকেনার বরকত মুছে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)
তাই আয়-রোজগারের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি লেনদেনে সত্যবাদিতা ও আমানতদারি বজায় রাখা জরুরি।
আরও পড়ুন: লেনদেনে সততা: ঈমানের দাবি, বরকতের উপায়
ভালো আয় থাকলেই সংসারে স্বচ্ছলতা আসে না। অপ্রয়োজনীয় খরচ ও অপচয়ের অভ্যাস থাকলে অর্থ দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)
তাই প্রয়োজন ও সামর্থ্য বুঝে ব্যয় করা উচিত। যা প্রয়োজন নেই, সেখানে অর্থ খরচ না করাই মুমিনের জন্য উত্তম।
ঘরে ফেরার সময় পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া ইসলামের সুন্দর একটি আদব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা পরস্পরকে সালাম করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা নুর: ৬১)
তাই বাইরে থেকে ঘরে ফিরে পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া উচিত। এতে ঘরে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের চর্চাও হয়।
খাবার শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ আদব। রাসুল (স.) বলেছেন, মানুষ যখন ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান বলে, ‘আজ তোমাদের এখানে রাত কাটানোর ও খাবার খাওয়ার সুযোগ নেই।’ (সহিহ মুসলিম: ২০১৮)
পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাবার খাওয়া এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করার মধ্যেও বরকতের কথা হাদিসে এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৬৪)
তাই খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
আরও পড়ুন: 'বিসমিল্লাহ'র বিস্ময়কর প্রভাব: কোনো কাজের শুরুতে পড়লে যা হয়
ঘরের বরকত ধরে রাখার জন্য শুধু কিছু বিষয় থেকে বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও শক্ত করতে হবে। নিয়মিত নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, ইস্তেগফার ও দোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করতে হবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
ভোরের সময়টিও কাজে লাগানো উচিত। রাসুল (স.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের জন্য ভোরবেলায় বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৬)
তাই ফজরের পর অকারণে ঘুমিয়ে না থেকে জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, পড়াশোনা বা হালাল কাজে সময় দেওয়া ভালো। এতে দিনের শুরুটা কাজে লাগানো হয় এবং রাসুল (স.)-এর বরকতের দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করা যায়।
ইস্তেগফারের মাধ্যমেও আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভের কথা কোরআনে এসেছে। হজরত নূহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা নূহ: ১০-১২)
মনে রাখতে হবে, বরকত মানেই বেশি অর্থ বা সম্পদ নয়। অল্প রিজিকে প্রয়োজন মিটে যাওয়া, পরিবারে শান্তি থাকা, নেক সন্তান, সুস্থতা এবং সময় ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারও বরকতের প্রকাশ হতে পারে।
তাই ঘরের বরকত কামনা করলে হালাল উপার্জন, আল্লাহর আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা ও নেক আমলের দিকে মনোযোগী হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ঘরগুলোকে ঈমান, শান্তি, ভালোবাসা ও বরকতে পূর্ণ করে দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদ