ধর্ম ডেস্ক
১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
তাওয়াফ হজ ও ওমরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। পবিত্র কাবা শরিফকে ঘিরে সাত চক্কর দিয়ে এ ইবাদত সম্পন্ন করা হয়। তাওয়াফের সময় কাবা থাকে তাওয়াফকারীর বাম পাশে। ফলে কাবাকে কেন্দ্র করে তাওয়াফের গতিপথ হয় ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে।
তাওয়াফের এই পদ্ধতির ভিত্তি কী? এর উত্তর রয়েছে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহতে। হজরত জাবির (রা.)-এর বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে নবীজি (স.)-এর হজের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। এতে তাঁর তাওয়াফের পদ্ধতিও বর্ণিত হয়েছে। তিনি কাবা শরিফকে বাম পাশে রেখে তাওয়াফ করেছেন। মুসলিমরা সেই সুন্নাহ অনুসরণ করেই কাবাকে বাম পাশে রেখে তাওয়াফ করে আসছেন।
তাওয়াফ শুরু হয় হাজরে আসওয়াদের বরাবর থেকে। কাবাকে বাম পাশে রেখে এগিয়ে গিয়ে এক চক্কর শেষে আবার হাজরে আসওয়াদের কাছে ফিরতে হয়। এভাবে সাত চক্করে একটি তাওয়াফ সম্পন্ন হয়।
হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছালে সম্ভব হলে তা স্পর্শ ও চুম্বন করা সুন্নাহ। তা সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারা করে তাকবির বলা যায়। তবে ভিড়ের মধ্যে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা চুম্বনের জন্য ধাক্কাধাক্কি করা কিংবা অন্য মুসল্লিকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। ইবাদতের পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিও খেয়াল রাখা জরুরি।
তাওয়াফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রুকনে ইয়ামানি। সম্ভব হলে এটি ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করা সুন্নাহ। সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারা করার প্রয়োজন নেই।
আরও পড়ুন: কাবা তাওয়াফের নিয়ম ও দোয়া
তাওয়াফের প্রতিটি চক্করের জন্য আলাদা কোনো দোয়া নির্ধারিত নেই। তাওয়াফকারী নিজের মতো করে শরিয়তসম্মত দোয়া ও জিকির করতে পারেন। তবে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এ দোয়াটি পড়া সুন্নাহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে-
‘রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আজাবান্নার।’ অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন। আর আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আল-বাকারা: ২০১)
সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইবরাহিমের কাছে দুই রাকাত নামাজ পড়া ওয়াজিব। সেখানে জায়গা পাওয়া না গেলে মসজিদুল হারামের অন্য স্থানেও তা আদায় করা যায়।
তাওয়াফের দিক নির্ধারণের মূল শরয়ি কারণ হিসেবে কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা মানুষের শারীরিক গঠনের ব্যাখ্যা সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়।
কিছু আলেম ও সুফি সাধক তাওয়াফের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে মানুষের হৃদয় বাম পাশে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, কাবাকে বাম পাশে রেখে তাওয়াফ মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে পবিত্র কাবার এক ধরনের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের প্রতীক। তবে এটি একটি আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা, তাওয়াফের নির্ধারিত শরয়ি কারণ নয়।
আরও পড়ুন: হজ ও ওমরার তাওয়াফের পার্থক্য কী
পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর একটি দোয়া রয়েছে, যেখানে তিনি আল্লাহর কাছে মানুষের অন্তরকে কাবার দিকে আকৃষ্ট করার প্রার্থনা করেছিলেন। আল্লাহ বলেন-
‘অতঃপর আপনি কিছু মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফল-ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।’ (সুরা ইবরাহিম: ৩৭)
আয়াতটিতে কাবার প্রতি মানুষের অন্তরের আকর্ষণের বিষয়টি এসেছে। তবে এটিকে তাওয়াফের গতিপথ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত হওয়ার সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করার নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।
ইসলামের অনেক ইবাদতের বিধানের অন্তর্নিহিত হেকমত মানুষের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নাও হতে পারে। মুমিনের দায়িত্ব হলো রাসুলুল্লাহ (স.) যেভাবে ইবাদত করেছেন, সেভাবেই তা পালন করা।
তাই তাওয়াফ কেন ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে- এর নিশ্চিত শরয়ি উত্তর হলো, নবীজি (স.) এভাবেই তাওয়াফ করেছেন এবং মুসলিমরা তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছেন। এর অন্তর্নিহিত দিকটি আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমরা একই পদ্ধতিতে কাবা শরিফ তাওয়াফ করে আসছেন। দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতিতে ভিন্নতা থাকলেও এই ইবাদতের পদ্ধতিতে তাদের কোনো পার্থক্য নেই।
সূত্র: সহিহ মুসলিম: ১২১৮; সহিহ বুখারি; কোরআন মাজিদ