Dhaka Mail Logo

ইসলাম

বিয়ের আগে জন্ম নেওয়া সন্তানের দায়িত্ব কার?

ধর্ম ডেস্ক

১১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

একটি শিশুর জন্ম কী পরিস্থিতিতে হয়েছে, সেটি তার নিজের সিদ্ধান্ত নয়। অথচ বাবা-মায়ের ভুলের দায় অনেক সময় সমাজের চোখে সেই নিষ্পাপ শিশুটিকেই বহন করতে হয়। ইসলাম শিশুকে তার জন্মের পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে না। একই সঙ্গে সন্তানের নাসাব বা বংশপরিচয় নির্ধারণেও সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, কোনো নারী বিয়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অন্য একজনকে বিয়ে করলে সেই সন্তানের নাসাব কার সঙ্গে যুক্ত হবে? জৈবিক পিতা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে সন্তানের পিতা হিসেবে গণ্য হবেন, নাকি মায়ের পরবর্তী স্বামীর সঙ্গে পিতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হবে?

শিশু বাবা-মায়ের গুনাহের জন্য দায়ী নয়

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪)

তাই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া শিশুকে তার জন্মের পরিস্থিতির কারণে অপমান বা হেয় করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে কোনো গুনাহ করেনি। তার সম্মান, নিরাপত্তা ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে।

পিতৃত্ব নির্ধারণে ইসলামের মূলনীতি

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সন্তান বৈধ শয্যার অধিকারীর এবং ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে বঞ্চনা।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

হাদিসটির মূলনীতি ‘আল-ওয়ালাদু লিল-ফিরাশ’ নামে পরিচিত। এখানে ‘ফিরাশ’ বলতে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক বা দাম্পত্য শয্যাকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বৈধ দাম্পত্যের ‘ফিরাশ’ বিদ্যমান থাকলে সেই ভিত্তিতে সন্তানের নাসাব স্বামীর সঙ্গে সাব্যস্ত হয়।

কোনো বিবাহিত নারী সন্তান জন্ম দিলে স্বামী শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তার পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। এ ধরনের ক্ষেত্রে শরিয়তে ‘লিআন’-এর বিধান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা নূরের ৬ থেকে ৯ নম্বর আয়াতে এর নির্দেশনা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: বাবার রেখে যাওয়া অবৈধ সম্পদ কি সন্তানের জন্য হালাল?

বিয়ের আগে সন্তান জন্ম নিলে কী হবে?

যদি সন্তানের জন্মের সময় মায়ের কোনো বিয়ে না থাকে, তাহলে ‘ফিরাশ’-এর ভিত্তিতে কোনো স্বামীর সঙ্গে তার নাসাব প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন থাকে না।

জমহুর ফকিহের মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের শরিয়তসম্মত পিতৃনাসাব জৈবিক পুরুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তার নাসাব মায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে উত্তরাধিকারসহ নাসাবভিত্তিক বিধানও সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

তবে কিছু আলেমের মতে, নারী অবিবাহিত থাকলে এবং জৈবিক পুরুষ নিজে সন্তানকে স্বীকার করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে নাসাবের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। 

মায়ের পরবর্তী স্বামী কি শিশুটির পিতা?

মায়ের পরবর্তী স্বামী শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করতে পারেন। তার শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়াও প্রশংসনীয় মানবিক কাজ।
তবে শুধু শিশুটির মাকে বিয়ে করার কারণে তিনি শরিয়তগতভাবে শিশুটির পিতা হয়ে যাবেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের পিতাদের নামে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত।’ (সুরা আহজাব: ৫)

অতএব, নতুন স্বামী অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে লালন-পালনের সম্পর্ককে নাসাবের সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

আরও পড়ুন: একজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের পর অন্য কাউকে বিয়ে করা জায়েজ?

ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের বিধান

জমহুর ফকিহের মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের জৈবিক পুরুষের সঙ্গে শরিয়তসম্মত পিতৃনাসাব প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পিতৃত্বের ভিত্তিতে তার ওপর ভরণপোষণের বিধানও প্রযোজ্য হয় না। এ ক্ষেত্রে সন্তানের নাসাব মায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তার ভরণপোষণ ও লালন-পালনের বিষয়টি মাতৃপরিবার ও সংশ্লিষ্ট শরিয়তগত বিধানের অধীনে বিবেচিত হয়।

একই কারণে জৈবিক পুরুষের সঙ্গে সাধারণ পিতা-পুত্রের মতো উত্তরাধিকার সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় হিবা করতে পারেন এবং অসিয়তের ক্ষেত্রেও শরিয়তের নির্ধারিত বিধান রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নাসাবের এই বিধান শিশুকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখার অনুমতি দেয় না। তার খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও লালন-পালনের ব্যবস্থা করা জরুরি। মায়ের পরবর্তী স্বামী স্বেচ্ছায় এসব দায়িত্ব নিলে তা প্রশংসনীয়।

শিশুকে অপমান করা যাবে না

শিশুর জন্মের পরিস্থিতি তার হাতে ছিল না। তাই তার জন্মের ঘটনা সামনে এনে তাকে অপমান করা, সামাজিকভাবে হেয় করা বা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ (সহিহ বুখারি)

সুতরাং বড়দের ভুলের দায় শিশুর ওপর চাপানো যাবে না। তার পরিচয়, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব।

মূল কথা হলো, বিয়ের আগে জন্ম নেওয়া সন্তানের বিষয়টি বুঝতে হলে নাসাব, ভরণপোষণ ও লালন-পালন এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। এমন সন্তানের নাসাব মায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। মায়ের পরবর্তী স্বামী লালন-পালনের দায়িত্ব নিলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তসম্মত পিতা হয়ে যান না। একইভাবে, জৈবিক পুরুষও শুধু জৈবিক সম্পর্কের কারণে জমহুরের মতে পিতৃনাসাবের অধিকারী হন না।

তবে শিশুর প্রতি ভালোবাসা, সুরক্ষা ও দায়িত্ব পালনের জায়গায় কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। কারণ অপরাধের দায় অপরাধীর, শিশুর নয়।

তথ্যসূত্র: সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা আহজাব: ৫; সুরা নূর: ৬-৯; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম এবং ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ