Dhaka Mail Logo

ইসলাম

বাংলায় দোয়া করবেন যেভাবে

ধর্ম ডেস্ক

১১ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম

দোয়া মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে বান্দা নিজের প্রয়োজন, দুর্বলতা, ভয়, আশা ও আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে। আমাদের সমাজে অনেকের ধারণা, দোয়া করতে হলে আরবি ভাষা জানতে হবে। কিন্তু নামাজের বাইরে সাধারণ দোয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। একজন মানুষ নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে মনের কথা বলতে পারেন। দোয়ার মূল বিষয় ভাষার সৌন্দর্য নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, বিনয় ও আন্তরিকতা।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন- নামাজের ভেতরের দোয়া এবং নামাজের বাইরের সাধারণ দোয়ার বিধান এক নয়। নামাজের ভেতরে অন্য ভাষায় দোয়া করার বিষয়ে ফকিহদের সতর্কতা রয়েছে। আর নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে প্রয়োজন তুলে ধরার বিষয়টি ভিন্ন।

মাসনুন দোয়া অগ্রাধিকার, না জানলে নিজের ভাষায়

দোয়ার ক্ষেত্রে কোরআনে বর্ণিত দোয়া এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো মাসনুন দোয়াগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। এসব দোয়ায় একজন মুমিন কী চাইবে এবং কীভাবে তার রবের কাছে চাইবে, তার সুন্দর শিক্ষা রয়েছে।

কোরআনে নবী-রাসুল ও নেককার বান্দাদের বহু দোয়া বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.)-ও সাহাবিদের বিভিন্ন প্রয়োজন ও পরিস্থিতির জন্য অনেক দোয়া শিখিয়েছেন। তাই এসব দোয়া শেখা ও অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করা উচিত।

তবে সবার পক্ষে সব মাসনুন দোয়া মুখস্থ রাখা সম্ভব হয় না। অনেকের আরবি পড়তে বা বুঝতে অসুবিধা হয়। আবার ব্যক্তিগত জীবনে এমন অনেক প্রয়োজন দেখা দেয়, যার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাসনুন দোয়া জানা নাও থাকতে পারে। এমন ক্ষেত্রে নামাজের বাইরে নিজের মাতৃভাষায় আল্লাহর কাছে মনের কথা বলা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ৪০ দোয়া

দোয়ার শুরু হোক আল্লাহর প্রশংসায়

দোয়ার কিছু আদব রয়েছে। এর মধ্যে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা অন্যতম। ফাদালা ইবনে উবাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি দোয়া করার সময় আল্লাহর প্রশংসা ও নবী (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠ না করেই দোয়া শুরু করলে রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে তাড়াহুড়ো করেছে বলে উল্লেখ করেন। এরপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা, নবী (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করে দোয়া করতে বলেন। (সুনান আবু দাউদ: ১৪৮১)

তাই বাংলায় দোয়া করলেও শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ করা উত্তম। এরপর নিজের প্রয়োজনের কথা বিনীতভাবে বলুন।

সহজ ভাষায় বলুন মনের কথা

আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্য কঠিন, অলংকারপূর্ণ বা সাহিত্যিক ভাষার প্রয়োজন নেই। যে ভাষায় একজন মানুষ নিজের কথা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারেন, সে ভাষায়ই তিনি তাঁর রবের কাছে প্রয়োজন জানাতে পারেন।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।’ (সুরাবাকারা: ১৮৬)

তাই দোয়ার সময় নিজের ভয়, দুশ্চিন্তা, অসহায়ত্ব কিংবা ভবিষ্যতের আশা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়। তবে শব্দের চেয়ে অন্তরের অবস্থা ও আল্লাহর প্রতি আস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: যে কারণে দোয়া মুখস্থ করা উচিত

দোয়ায় থাকুক দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ

দোয়া শুধু দুনিয়াবি চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখাই উত্তম। একজন মুমিনের দোয়ায় দুনিয়া ও আখেরাত দুই জীবনের কল্যাণই থাকা উচিত।

কোরআনে শেখানো হয়েছে- ‘হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা বাকারা: ২০১)

এ দোয়ায় দুনিয়ার কল্যাণ, আখেরাতের কল্যাণ এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি সবই চাওয়া হয়েছে। তাই কোরআন ও সুন্নাহর দোয়াগুলো অর্থ বুঝে শেখার চেষ্টা করা ভালো।

সেজদায় দোয়া ও নামাজের বিধান

সেজদা দোয়ার জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। তাই সে সময় বেশি বেশি দোয়া করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)

তবে নামাজের সেজদায় বাংলায় দোয়া করার বিষয়টি আলাদা। নামাজের ভেতরে মাসনুন আরবি দোয়া পড়াই সতর্কতামূলক ও উত্তম। আর নামাজের বাইরে হাত তুলে বা অন্য বৈধ সময়ে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: মোবাইলে দেখে দোয়া পড়া যাবে?

দোয়া কবুলে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

দোয়ার সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনেরও সম্পর্ক রয়েছে। হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্যের ব্যাপারে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে রয়েছে, এলোমেলো চুল ও ধুলোমলিন অবস্থায় হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে। কিন্তু তার খাবার, পানীয়, পোশাক ও আহার্য হারাম। এরপর বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)

হাদিসটি দোয়ার সঙ্গে হালাল জীবনযাপনের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। তাই দোয়ার পাশাপাশি নিজের উপার্জন, খাবার ও জীবনযাপনও হালাল রাখার চেষ্টা করা জরুরি।

দ্রুত ফল না পেলেও হতাশ নয়

দোয়া করার পর প্রত্যাশিত ফল দ্রুত না এলে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) দোয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করেছেন।

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘বান্দার দোয়া সর্বদা গৃহীত হয় যদি না সে অন্যায় কাজ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দোয়া করে এবং তাড়াহুড়া না করে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! তাড়াহুড়া করা কি? তিনি বললেন, সে বলতে থাকে, আমি দোয়া তো করেছি, কিন্তু আমি দেখতে পেলাম না যে, তিনি আমার দোয়া কবুল করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)

তাই দোয়া করে ধৈর্য ধরতে হবে। কখন, কীভাবে এবং কোন সময়ে কোনো দোয়ার ফল দেওয়া হবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। বান্দার দায়িত্ব হলো তাঁর কাছে চাওয়া এবং তাঁর ওপর আস্থা রাখা।

দোয়া হোক আন্তরিক

দোয়ার জন্য আন্তরিকতাপূর্ণ ও বিনয় ভাব প্রকাশ পায় এমন সুন্দর শব্দ জানা ভালো; এক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর দোয়া উত্তম। তবে আরবি ভাষার দোয়া জানা না থাকলে কেউ যেন আল্লাহর কাছে নিজের কথা বলতে সংকোচ বোধ না করেন। নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় তিনি তাঁর প্রয়োজন, অনুতাপ, ভয়, আশা ও আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর কাছে তুলে ধরতে পারেন।

দোয়ার প্রাণ হলো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, বিনয় ও আন্তরিকতা। আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ১৮৬, ২০১; সহিহ মুসলিম: ৪৮২, ১০১৫, ২৭৩৫; সুনান আবু দাউদ: ১৪৮১