ধর্ম ডেস্ক
০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম
ইসলামে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআন নাজিলের প্রথম শব্দেই মানুষকে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (স.)-ও জ্ঞান অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সাহাবিদের মধ্যে হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা ও বিচারবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন সাহসী যোদ্ধা, কোরআন ও ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ।
হজরত আলী (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চাচাতো ভাই। তাঁর বাবা ছিলেন নবীজি (স.)-এর চাচা আবু তালিব। অল্প বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, কিশোরদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন।
শৈশব থেকেই তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। ফলে কোরআনের শিক্ষা, ইসলামের বিধান ও নবীজি (স.)-এর জীবনাদর্শ কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তিনি কোরআনের ব্যাখ্যা ও ইসলামি বিধানে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
কোরআনের আয়াত, নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ইসলামি বিধান সম্পর্কে হজরত আলী (রা.)-এর জ্ঞান ছিল গভীর। বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে সাহাবিরা তাঁর মতামত গ্রহণ করতেন।
আবু জুহাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি হজরত আলী (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোরআন ছাড়া তাঁদের কাছে অন্য কোনো ওহি আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, কোরআন ছাড়া এমন কোনো ওহি নেই। তবে আল্লাহ যাকে কোরআনের সঠিক উপলব্ধি দান করেন, তা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ। (সহিহ বুখারি: ১১১)
এই বক্তব্য তাঁর জ্ঞান, বিনয় ও কোরআনকেন্দ্রিক চিন্তার পরিচয় দেয়।
আরও পড়ুন: যাঁকে দেখলেই শয়তান পালাত: হজরত ওমরের ৪ শক্তিশালী গুণ
রাসুলুল্লাহ (স.) গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্বে হজরত আলী (রা.)-এর ওপর আস্থা রেখেছেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির দলিল লেখার দায়িত্ব তিনি পালন করেন। (সহিহ বুখারি)
হিজরতের রাতেও তিনি অসাধারণ সাহসের পরিচয় দেন। কোরাইশরা যখন রাসুলুল্লাহ (স.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল, তখন নবীজি (স.)-এর নির্দেশে তিনি তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকেন। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেও তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (স.) আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশে রওনা হন।
খাইবার বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (স.) ঘোষণা করেন, ‘আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলও তাঁকে ভালোবাসেন।’ পরদিন তিনি হজরত আলী (রা.)-এর হাতে পতাকা তুলে দেন। এরপর আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে মুসলিমদের বিজয় দান করেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই ঘটনা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও নেতৃত্বের যোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
হজরত আলী (রা.) শুধু জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করেছেন। খলিফা হওয়ার পর তিনি রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
তাঁর ন্যায়বিচারের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে আলোচিত। একবার তাঁর একটি বর্ম হারিয়ে যায়। পরে তিনি সেটি এক অমুসলিম ব্যক্তির কাছে দেখতে পান। রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতার ব্যবহার করেননি। তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
আরও পড়ুন: যে পরিস্থিতিতে আবু বকরের সিদ্দিক উপাধি লাভ
বিচারক তাঁর কাছে প্রমাণ চাইলে তিনি তা উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে আদালত অমুসলিম ব্যক্তির পক্ষেই রায় দেন। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ন্যায়পরায়ণতা ওই ব্যক্তিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরে তিনি স্বীকার করেন, বর্মটি হজরত আলী (রা.)-এরই ছিল এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। হজরত আলী (রা.) তখন বর্মটি তাঁকে উপহার দিয়ে দেন।
এ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও আইনের শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হজরত আলী (রা.) ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তা। তাঁর খুতবা, পত্র ও উপদেশ পরবর্তী সময়ে ‘নাহজুল বালাগা’ নামে সংকলিত হয়। একাদশ শতাব্দীতে সাইয়্যেদ শরিফ রাদী এটি সংকলন করেন।
ইসলামি সাহিত্যে গ্রন্থটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তবে এর সব বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই গবেষণার ক্ষেত্রে এর বক্তব্যগুলো পৃথকভাবে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে এতে থাকা বহু নৈতিক শিক্ষা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে ইসলামি সাহিত্য ও নৈতিক দর্শনের আলোচনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
নাহজুল বালাগায় তাঁর নামে একটি প্রসিদ্ধ বাণী উদ্ধৃত হয়েছে, ‘জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি বিতরণ করলে কমে না, বৃদ্ধি পায়।’ (নাহজুল বালাগা, উপদেশ: ১৯৫)
তাঁর নামে ‘দিওয়ানে আলী’ শিরোনামে একটি কবিতা সংকলনও প্রচলিত রয়েছে। এতে জ্ঞান, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির নানা শিক্ষা পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: ধৈর্য ও ঈমানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হজরত বিলাল (রা.)
হজরত আলী (রা.)-এর জীবন থেকে মুসলিমরা শিখতে পারে-
হজরত আলী (রা.) ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সান্নিধ্যে অর্জিত জ্ঞান তিনি জীবন, নেতৃত্ব ও বিচারকার্যে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর জীবন আজও জ্ঞানচর্চা, বিনয় ও নৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম, ইবনে হিশামের আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনে সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরা ও নাহজুল বালাগা