Dhaka Mail Logo

ইসলাম

ইহরাম অবস্থায় নারীদের মুখ ঢাকার বিধান কী

ধর্ম ডেস্ক

০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

হজ ও ওমরা পালনের সময় ইহরাম গ্রহণের পর কিছু বিশেষ বিধান মেনে চলতে হয়। এ সময় নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে মাসয়ালাটি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়, তা হলো- ইহরাম অবস্থায় কি মুখ খোলা রাখা বাধ্যতামূলক, নাকি পর্দা করা যাবে? অনেকেই মনে করেন, ইহরাম গ্রহণের পর মুখ খোলা রাখাই শরিয়তের নির্দেশ। আবার কেউ সাধারণ সময়ের মতো মুখে লেগে থাকে এমন নিকাব ব্যবহার করেন। অথচ শরিয়তের নির্দেশনা এ দুই ধারণার কোনোটিই নয়। কোরআন, সুন্নাহ ও ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিধান তুলে ধরেছে।

নিকাব পরা কি নিষিদ্ধ?

রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘ইহরাম অবস্থায় কোনো নারী নিকাব পরবে না এবং হাতমোজাও পরবে না।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৩৮)

ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে ‘নিকাব’ বলতে এমন মুখাবরণ বোঝানো হয়েছে, যা সরাসরি মুখমণ্ডলের সঙ্গে লেগে থাকে। অর্থাৎ মুখে সেঁটে থাকে- এ ধরনের নিকাব ইহরাম অবস্থায় ব্যবহার করা যাবে না। (আলবাহরুর রায়েক: ২/২২৩)

তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইহরাম অবস্থায় নারীর জন্য পর্দার বিধান উঠে যায়। বরং মুখে কাপড় সেঁটে না রেখে শরিয়তসম্মত উপায়ে পর্দা করতে হবে।

আরও পড়ুন: হজে নারীদের সতর্কতা: কী করবেন, কী করবেন না

আয়েশা (রা.)-এর আমল থেকে যা জানা যায়

ইহরাম অবস্থায় নারীরা কীভাবে পর্দা করবেন, তার বাস্তব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর আমলে। 

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম, তখন পুরুষরা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের কাছাকাছি আসত, তখন আমরা মাথার ওপর থেকে চাদর টেনে চেহারার ওপর ঝুলিয়ে দিতাম। তারা চলে গেলে আমরা তা সরিয়ে নিতাম।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৯৩৫)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, ইহরাম অবস্থায়ও নারীদের জন্য পর্দার বিধান বহাল ছিল। তবে তারা মুখে সেঁটে থাকে এমন নিকাব ব্যবহার করতেন না; বরং মাথার ওপর থেকে চাদর ঝুলিয়ে চেহারা আড়াল করতেন।

ব্যবহারিক সমাধান

বর্তমানে এ বিধান পালন সহজ করতে বাজারে বিশেষ ধরনের ‘ইহরাম ক্যাপ’ পাওয়া যায়। এই ক্যাপের ওপর দিয়ে ওড়না বা চাদর ঝুলিয়ে দিলে মুখে কাপড়ের সরাসরি স্পর্শ ছাড়াই পর্দা করা সম্ভব হয়। ফলে পর্দার বিধানও রক্ষা হয়, আবার ইহরামের শর্তও অক্ষুণ্ন থাকে।

আরও পড়ুন: স্বামী অনুমতি না দিলে হজ করা যাবে?

অনিচ্ছাকৃতভাবে কাপড় মুখে লেগে গেলে

হজ বা ওমরার সময় ভিড়ের মধ্যে চলাফেরা কিংবা বাতাসের কারণে ঝুলিয়ে রাখা ওড়না বা চাদর সাময়িকভাবে মুখে লেগে যেতে পারে।

ফকিহদের মতে, এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত ও স্বল্প সময়ের স্পর্শে ইহরামের কোনো ক্ষতি হয় না। তাই এ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং শরিয়তসম্মত উপায়ে পর্দার বিধান পালন অব্যাহত রাখাই উচিত। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৮৮, ৫২৭)

একজন মুসলিম নারীর করণীয়

ইহরাম অবস্থায় একজন মুসলিম নারীর উচিত-

  • মুখে সেঁটে থাকে এমন নিকাব পরিহার করা।
  • প্রয়োজন হলে মাথার ওপর থেকে ওড়না বা চাদর ঝুলিয়ে শরিয়তসম্মতভাবে পর্দা করা।
  • ইহরামের বিধান ও পর্দার বিধান উভয়টি যথাযথভাবে পালন করা।
  • অনিচ্ছাকৃতভাবে অল্প সময় কাপড় মুখে লেগে গেলে অযথা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হওয়া।
  • তাওয়াফ ও অন্যান্য ইবাদত সুন্নাহ অনুযায়ী একাগ্রতার সঙ্গে আদায় করা।

মোটকথা, ইহরাম অবস্থায় মুখে সেঁটে থাকে এমন নিকাব পরা নিষিদ্ধ, কিন্তু পর্দার বিধান রহিত হয় না। তাই সুন্নাহ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে মাথার ওপর থেকে কাপড় ঝুলিয়ে পর্দা করতে হবে। এভাবেই ইহরামের বিধান ও পর্দার বিধান- দুইটিই যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ১৮৩৮; আবু দাউদ: ১৮৩৩; ইবনে মাজাহ: ২৯৩৫; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা: ১৪৫৩৯–১৪৫৪০; আলবাহরুর রায়েক: ২/২২৩; বাদায়েুস সানায়ে: ২/৪১০; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২৩৮; রদ্দুল মুহতার: ২/৪৮৮, ৫২৭