Dhaka Mail Logo

ইসলাম

জ্বিনের সাহায্য নেওয়া কি বৈধ? কোরআন-হাদিস কী বলে

ধর্ম ডেস্ক

০২ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

অদৃশ্য জগত নিয়ে মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। বিশেষ করে জ্বিনকে ঘিরে নানা গল্প, বিশ্বাস ও দাবি সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। কেউ হারানো জিনিস খুঁজে পেতে, কেউ ভবিষ্যতের খবর জানতে, আবার কেউ রোগমুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি বা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জ্বিনের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য কোরআন ও সুন্নাহ এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে, তা জানা প্রয়োজন।

জ্বিনও আল্লাহর সৃষ্টি

জ্বিন কোনো অলৌকিক শক্তির স্বাধীন সত্তা নয়; তারাও আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি। তবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর জ্বিনকে তিনি সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা থেকে।’ (সুরা রহমান: ১৫)

জ্বিনদের মধ্যেও ঈমানদার ও অবিশ্বাসী উভয় শ্রেণি রয়েছে। তারা জীবনযাপন করে, বংশবিস্তার করে এবং নির্ধারিত সময় এলে মৃত্যুবরণ করে। মানুষের মতো তাদেরও আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জ্বিনের সাহায্য চাওয়া কি বৈধ?

কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জ্বিনের কাছে সাহায্য চাওয়া বা তাদের ওপর নির্ভর করা একজন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। একজন মুমিন বিপদে-আপদে, প্রয়োজন ও আশা-ভরসার ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই কিছু মানুষ কিছু জ্বিনের আশ্রয় নিত। ফলে তারা জ্বিনদের ঔদ্ধত্য আরও বাড়িয়ে দিত।’ (সুরা জ্বিন: ৬)

আরও পড়ুন: টয়লেটে সুগন্ধি রাখলে কি জ্বিনের কবল থেকে বাঁচা যায়? 

অন্য এক আয়াতে কেয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘হে জ্বিন সম্প্রদায়! তোমরা তো বহু মানুষকে বিপথগামী করেছিলে।’ তখন তাদের অনুসারী মানুষ বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমরা একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলাম।’ (সুরা আনআম: ১২৮)

তাফসিরবিদরা বলেন, এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মানুষ ও জ্বিনের মধ্যে এমন নির্ভরশীল সম্পর্ক ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এ পথ মানুষকে ধীরে ধীরে বিভ্রান্তি ও আকিদাগত বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।

সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনা কি এর ব্যতিক্রম?

কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, হজরত সুলাইমান (আ.) তো জ্বিনদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়েছিলেন। তাহলে অন্যরা কেন পারবে না?

এর উত্তর হলো- এটি ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর জন্য বিশেষ একটি মুজিজা ও অনন্য নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, তিনি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন, যা আমার পরে আর কাউকে দেওয়া হবে না।’ (সুরা সাদ: ৩৫)

তাই সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনা সাধারণ মানুষের জন্য অনুসরণযোগ্য কোনো পদ্ধতি নয়। তাঁর প্রতি যে বিশেষ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, তা অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য নয়।

জ্বিন কি গায়েবের খবর জানে?

সমাজে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে জ্বিনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বা অদৃশ্য জগতের খবর জানা যায়। কিন্তু কোরআন এ বিশ্বাসকে স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে, তারা কেউই গায়েব জানে না, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।’ (সুরা নামল: ৬৫)

আরও পড়ুন: জ্বিনের অস্তিত্ব অস্বীকারের সুযোগ নেই

এ বিষয়ে কোরআন হজরত সুলাইমান (আ.)-এর একটি ঘটনাও উল্লেখ করেছে। তাঁর মৃত্যু হওয়ার পরও তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জ্বিনরা তাঁকে জীবিত ভেবে কাজ করতে থাকে। পরে উইপোকা তাঁর লাঠি খেয়ে ফেললে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তখনই জ্বিনরা বুঝতে পারে, তিনি অনেক আগেই ইন্তেকাল করেছেন।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তারা গায়েব জানত, তবে তারা এই লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির মধ্যে পড়ে থাকত না।’ (সুরা সাবা: ১৪)

এ ঘটনাই প্রমাণ করে, জ্বিনদেরও গায়েব জানার ক্ষমতা নেই। অদৃশ্য জগতের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই।

জ্যোতিষী ও গণকদের বিষয়ে ইসলামের সতর্কবাণী

ভাগ্য গণনা, অদৃশ্য জগতের খবর বা ভবিষ্যৎ জানার দাবিদারদের ব্যাপারে ইসলাম কঠোর সতর্কতা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হবে না।’
(সহিহ মুসলিম: ২২৩০)

এ কারণে আলেমরা বলেন, জ্যোতিষী, গণক কিংবা গায়েব জানার দাবিদারদের কাছে যাওয়া একজন মুসলিমের আকিদার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। একজন মুমিনের ভরসা ও নির্ভরতা একমাত্র আল্লাহর ওপরই হওয়া উচিত।

‘মুয়াক্কিল’ বা মুসলিম জ্বিন ব্যবহারের দাবি

কখনো কখনো কিছু মানুষ দাবি করেন, তারা মুসলিম জ্বিন বা ‘মুয়াক্কিল’-এর সাহায্যে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করেন। কিন্তু শরিয়তে এ ধরনের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।

কেউ এমন দাবি করলেই তা সত্য বলে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব দাবির সত্যতা যাচাইও সম্ভব নয়। আলেমরা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের সম্পর্ক অনেক সময় প্রতারণা, কুসংস্কার ও আকিদাগত বিভ্রান্তির পথ তৈরি করে। বাস্তবেও দেখা যায়, জ্বিনের সহযোগিতার নামে এমন অনেক শর্ত বা কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা ইসলামের শিক্ষা ও শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আরও পড়ুন: জ্বিন: আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, নিউরোসায়েন্স ও বাস্তবতা

সাহাবি ও তাবেয়িদের আমল

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সাহাবি কিংবা তাবেয়িদের জীবনে জ্বিনের সাহায্যে দ্বীনি বা দুনিয়াবি কাজ সম্পন্ন করার কোনো গ্রহণযোগ্য নজির পাওয়া যায় না। অথচ দ্বীনের বিষয়ে তাঁদের অনুসরণই একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও আদর্শ পথ।

জ্বিনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার ইসলামি উপায়

জ্বিনের কষ্ট বা অশুভ প্রভাবের আশঙ্কা থাকলে ইসলাম কোনো রহস্যময় পদ্ধতির দিকে আহ্বান জানায় না। বরং কোরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত আমলগুলো করার নির্দেশ দেয়। যেমন-

  • আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা
  • কোরআনের আয়াত দিয়ে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) করা
  • নিয়মিত আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
  • সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়া
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকিরের প্রতি যত্নবান হওয়া

জ্বিনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান, হারানো জিনিস উদ্ধার, ভাগ্য গণনা বা রোগ নিরাময়ের মতো দাবি শুনলে সতর্ক থাকা উচিত। এসব দাবির আড়ালে প্রতারণা, কুসংস্কার কিংবা শিরকের মতো গুরুতর বিপদের আশঙ্কা থাকতে পারে।

মুমিনের বিশ্বাস হবে- দৃশ্য ও অদৃশ্য সব কিছুর মালিক এবং সব ধরনের উপকার-অপকারের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। তাই জ্বিন বা অন্যকোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে সরাসরি আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। আর প্রয়োজন হলে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ ও বৈধ চিকিৎসার আশ্রয় নেওয়াই ইসলামের নির্দেশিত পথ।

তথ্যসূত্র: সুরা রহমান: ১৫; সুরা জিন: ৬; সুরা আনআম: ১২৮; সুরা সাদ: ৩৫; সুরা নামল: ৬৫; সুরা সাবা: ১৪; সহিহ মুসলিম: ২২৩০