ধর্ম ডেস্ক
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
মানুষের জীবন যত আধুনিক হচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। খালি চোখে দেখা যায় না এমন এই ক্ষুদ্র কণাগুলো দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকেরা।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মিসওয়াক। মুখ ও দাঁতের পরিচর্যার এই প্রাকৃতিক উপায়টি চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে রাসুলুল্লাহ (স.) উম্মতকে শিখিয়েছেন। একজন মুসলমানের কাছে মিসওয়াক শুধু দাঁত পরিষ্কারের উপকরণ নয়। এটি পরিচ্ছন্নতা, ইবাদতের প্রস্তুতি এবং সুন্নাহর অনুসরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার মর্যাদা অত্যন্ত বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা বাকারা: ২২২)
মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতাও এই পবিত্রতারই একটি অংশ। তাই রাসুলুল্লাহ (স.) মিসওয়াকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সাহাবিদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তাহলে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি: ৮৮৭)
আরও পড়ুন: ইসলামে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব
এই হাদিস থেকেই মিসওয়াকের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। এটি শুধু দাঁত পরিষ্কারের একটি উপায় নয়, ইবাদতের প্রস্তুতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সুন্নাহ।
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৮৯)
এ কারণে মিসওয়াক একজন মুসলমানের জন্য শুধু পরিচ্ছন্নতার উপকরণ নয়। এটি এমন একটি সুন্নাহ, যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা যায় এবং সওয়াবেরও আশা করা যায়।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের শেষ সময়েও মিসওয়াকের গুরুত্ব কমেনি। শেষ অসুস্থতার মধ্যেও তিনি এ সুন্নাহ আমল করেছেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেষ অসুস্থতার সময় আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) একটি তাজা মিসওয়াকের ঢাল হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। নবীজি (স.) সেটির দিকে তাকালে আয়েশা (রা.) বুঝতে পারেন, রাসুলুল্লাহ (স.) মিসওয়াক করতে চান। তখন তিনি সেটি নরম করে তাঁর হাতে তুলে দেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘তিনি তা দিয়ে এমন সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার করলেন, এর আগে তাঁকে কখনও এভাবে মিসওয়াক করতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি: ৪৪৫১)
জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও পরিচ্ছন্নতার প্রতি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এই যত্ন মুসলমানদের জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
আরও পড়ুন: নামাজের আগে মিসওয়াকের ফজিলত
মিসওয়াক ছিল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত আমল। বিশেষ করে ইবাদতের আগে তিনি এর প্রতি গুরুত্ব দিতেন।
হজরত হুজায়ফা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) রাতে নামাজের জন্য উঠলে প্রথমে মিসওয়াক করতেন।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৫)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ঘরে প্রবেশের সময়ও তিনি মিসওয়াক করতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৫১)
হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি একবার দেখেন রাসুলুল্লাহ (স.) মিসওয়াক দিয়ে মুখের ভেতর ভালোভাবে পরিষ্কার করছেন। (সহিহ বুখারি: ২৪৪)
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার প্রতি রাসুলুল্লাহ (স.) সব সময়ই বিশেষ যত্নশীল ছিলেন।
মিসওয়াক শুধু রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আমল নয়। এটি পূর্ববর্তী নবীদেরও সুন্নাহ।
হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় নবীদের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত- লজ্জাশীলতা, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক করা এবং বিবাহ।’ (জামে তিরমিজি: ১০৮০)
আরও পড়ুন: অজুর পূর্ণতা: হারিয়ে যাওয়া কিছু সুন্নাহর খোঁজে
বর্তমানে দাঁতের পরিচর্যায় টুথব্রাশ ও টুথপেস্টের ব্যবহারই বেশি। ইসলাম এগুলো ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তবে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হওয়ায় মিসওয়াকের মর্যাদা মুসলমানদের কাছে স্বতন্ত্র।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর অনেকেই আবার প্রাকৃতিক বিকল্পের দিকে নজর দিচ্ছেন। সেই আলোচনায় নতুন করে উঠে এসেছে মিসওয়াকের নাম। এটি প্রাকৃতিক, সহজলভ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
একজন মুসলমানের জন্য মিসওয়াকের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। এটি ব্যবহার করলে মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহও পালন করা হয়।
প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞান যতই এগিয়ে যাক, পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা এবং সুন্নাহর শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। সে কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও মিসওয়াক মুসলমানদের কাছে শুধু একটি প্রাকৃতিক উপকরণ নয়, বরং পরিচ্ছন্নতা ও সুন্নাহর জীবন্ত প্রতীক।