মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অজুর পূর্ণতা: হারিয়ে যাওয়া কিছু সুন্নাহর খোঁজে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

অজুর পূর্ণতা: হারিয়ে যাওয়া কিছু সুন্নাহর খোঁজে

নামাজ জান্নাতের চাবিকাঠি, আর অজুর মাধ্যমে সেই চাবিকাঠিকে শাণিত করা হয়। প্রতিদিন কয়েকবার অজু করলেও আমাদের অজান্তেই অজুর অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ পালনে আমরা অবহেলা করে ফেলি। অথচ এই ছোট ছোট আমলগুলোই একজন মুমিনের অজুর মানকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলে।

১. মেসওয়াক: প্রভুর সন্তুষ্টির মাধ্যম

অজুর শুরুতে মেসওয়াক করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা বর্তমানে অনেকের ক্ষেত্রেই টুথব্রাশে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যদি না আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হতো, তবে আমি তাদের প্রতি অজুর সময় মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৯৯২৮)
মেসওয়াক করা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। অজুর শুরুতে মেসওয়াক করলে বিশেষ সওয়াব লাভ হয় এবং নামাজের একাগ্রতা বাড়ে।

আরও পড়ুন: অজু গোসলে কোনো অঙ্গ শুকনো থাকলে যে ক্ষতি

২. মিতব্যয়িতা: এক মগ পানিতে অজু

আধুনিক যুগে আমরা ট্যাপ ছেড়ে অঝোরে পানি অপচয় করি। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.) মাত্র এক ‘মুদ’ বা প্রায় ৬২৫ মিলি (এক মগের সামান্য বেশি) পানি দিয়ে পুরো অজু সম্পন্ন করেছেন (সহিহ মুসলিম)। পানির অপচয় রোধ করা অজুর অন্যতম সুন্নাহ। প্রবাহিত নদীতে অজু করলেও যেন পানি অপচয় না হয়—এই শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে। পানির অপচয় কমিয়ে আনা আমাদের অজুর অন্যতম হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য।

৩. খিলাল: প্রতিটি আঙুলের হক আদায়

তাড়াহুড়ো করে অজু করতে গিয়ে আমরা হাত ও পায়ের আঙুলের ফাঁকগুলোতে পানি পৌঁছানোর বিষয়টি ভুলে যাই। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) অজুর সময় তাঁর হাতের ও পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করতেন (সুনানে তিরমিজি: ৩৯)। পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে পায়ের আঙুলের ফাঁকগুলো পরিষ্কার করা অজুর একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।

আরও পড়ুন: অজুর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

৪. অঙ্গগুলো ঘষে ধোয়া

অনেকে কেবল অজুর অঙ্গগুলোর ওপর পানি ঢেলে দেন। কিন্তু সুন্নাহ হলো প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় হাত দিয়ে তা ঘষিয়ে ধোয়া। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে কোনো অংশ শুকনো নেই এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি শরীরকে ইবাদতের জন্য আরও সতেজ করে তোলে।

৫. কেবলার দিকে মুখ করে বসা এবং নিস্তব্ধতা

অজু করার সময় কেবলার দিকে মুখ করে বসা এবং অনর্থক কথা না বলা সুন্নাহসম্মত আদব। অজুর সময় দুনিয়াবি গল্পগুজব না করে মনে মনে আল্লাহর ধ্যান করা এবং অজুর দোয়াগুলো পড়লে অজুর একাগ্রতা বজায় থাকে।

আরও পড়ুন: কিবলা কতটা বাঁকা থাকলেও নামাজ শুদ্ধ হবে

৬. পূর্ণ মাথা মাসেহ

অনেকেই অজুর সময় মাথার সামান্য অংশ বা শুধু সামনের দিকটা মাসেহ করেন। ফরজ আদায়ের জন্য মাথার এক-চতুর্থাংশ মাসেহ করা যথেষ্ট হলেও, পুরো মাথা মাসেহ করা একটি অত্যন্ত বরকতময় সুন্নাহ ও মোস্তাহাব আমল। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর দুই হাত মাথার সামনে থেকে শুরু করে পেছনে ঘাড় পর্যন্ত নিতেন এবং পুনরায় সেখান থেকে সামনে ফিরিয়ে আনতেন (সহিহ বুখারি: ১৮৫)। পুরো মাথা মাসেহ করার এই প্রশান্তি অজুর পূর্ণতা দান করে।

৭. অজুর পরের সেই বিশেষ দোয়া

অজু শেষ করার পর দোয়া পড়া একটি বিশাল সওয়াবের কাজ যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে বলবে- ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’ তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয়; সে যে কোনোটি দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। (সহিহ মুসলিম: ২৩৪)

৮. তাহিয়াতুল অজু: দুই রাকাত নামাজ

অজু করার পর অঙ্গগুলো শুকানোর আগেই দুই রাকাত নামাজ পড়া (তাহিয়াতুল অজু) অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ। হজরত বেলাল (রা.)-এর জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই আমলটি। শত ব্যস্ততার মাঝে অন্তত মাঝেমাঝে এই দুই রাকাত নামাজ আমাদের আত্মিক প্রশান্তি ও বাড়তি ফজিলতের উৎস হতে পারে।

অজু মনের ময়লা দূর করারও একটি প্রক্রিয়া। প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় যদি আমরা কল্পনা করি যে আমাদের গুনাহগুলো পানির সাথে ঝরে যাচ্ছে, তবে সেই অজু হবে এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। হারিয়ে যাওয়া এই সুন্নাহগুলো পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই আমাদের অজু ও নামাজ পূর্ণতা পেতে পারে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর