ধর্ম ডেস্ক
২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
অন্যায় দেখেও চুপ থাকা কি ইসলামের শিক্ষা? আবার প্রতিবাদের নামে ভাঙচুর, গালিগালাজ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কি বৈধ? দুটোরই স্পষ্ট জবাব দিয়েছে কোরআন ও সুন্নাহ। ইসলাম যেমন জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে দেখিয়েছে, তেমনি সেই প্রতিবাদে শিষ্টাচার, ন্যায়বিচার, সংযম ও প্রজ্ঞা বজায় রাখারও নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না। তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, তার কথা ভিন্ন।’ (সুরা নিসা: ১৪৮)
জুলুমের শিকার ব্যক্তি নিজের অধিকার আদায় ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। তবে সেই প্রতিবাদ হতে হবে ন্যায়সংগত, দায়িত্বশীল এবং সীমার মধ্যে।
অন্যায়ের প্রতিবাদকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাসুলুল্লাহ (স.)। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে মুখের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে। আর যদি সেটিও সম্ভব না হয়, তবে অন্তরে তা ঘৃণা করে। আর এটাই ইমানের দুর্বলতম স্তর।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৯)
এই হাদিসে অন্যায় প্রতিরোধের তিনটি স্তর তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রতিটি স্তরের প্রয়োগ নির্ভর করে দায়িত্ব, ক্ষমতা ও পরিস্থিতির ওপর। ‘হাত দিয়ে প্রতিহত করা’ বলতে যার বৈধ কর্তৃত্ব রয়েছে, তার মাধ্যমে অন্যায় বন্ধ করাকে বোঝানো হয়েছে। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবারপ্রধান কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজ নিজ দায়িত্বের পরিসরে এ কর্তব্য পালন করবেন। সাধারণ মানুষের জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
যাদের এমন কর্তৃত্ব নেই, তারা মুখে, লেখনীর মাধ্যমে বা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। প্রয়োজন হলে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়েও প্রতিবাদ করা যেতে পারে। আর সেটিও সম্ভব না হলে অন্তরে অন্যায়কে ঘৃণা করতে হবে।
আরও পড়ুন: অন্যায়ের প্রতিবাদ না করার ক্ষতি, কোরআন হাদিস যা বলছে
অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নীরব থাকা ইসলাম সমর্থন করে না। হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে, কিন্তু তা কবুল করা হবে না।’ (জামে তিরমিজি: ২১৬৯)
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নতুন কোনো অন্যায় করা ইসলামের শিক্ষা নয়। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নিরপরাধ মানুষের জানমালের ক্ষতি কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে প্রতিবাদ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা বাকারা: ১৯০)
প্রতিবাদের ভাষাও হতে হবে শালীন, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ। গালি, অপমান, বিদ্বেষ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ একজন মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে কাজে নম্রতা থাকে, তা সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। আর যে কাজ থেকে নম্রতা তুলে নেওয়া হয়, তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০৮)
অন্যায়ের প্রতিবাদে আবেগের পাশাপাশি হিকমত বা প্রজ্ঞারও প্রয়োজন রয়েছে। তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে এমন পথ বেছে নেওয়া উচিত, যাতে অন্যায় প্রতিরোধ হয়, নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
অন্যায়ের প্রতিবাদে প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণের একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় একটি হাদিসে।
এক ব্যক্তি প্রতিবেশীর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এলে তিনি তাকে নিজের আসবাবপত্র ঘরের বাইরে এনে রাস্তায় রাখতে বলেন। লোকজন কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেশীর আচরণের কথা জানান। এতে মানুষ ওই প্রতিবেশীর আচরণের নিন্দা করে। শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশী লজ্জিত হয়ে নিজের আচরণ সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৫৩)
আরও পড়ুন: অন্যায় থামিয়ে দেওয়া মহান ইবাদত
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ সবসময় সংঘর্ষের মাধ্যমে করতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেও অন্যায়ের কার্যকর প্রতিকার সম্ভব।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু প্রতিবাদের নামে যাচাইহীন তথ্য, পুরোনো ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামসম্মত নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা হুজরাত: ৬)
একইভাবে গালিগালাজ, বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহননও ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে-ই, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ১০)
তাই অনলাইনে হোক বা অফলাইনে, একজন মুসলমানের প্রতিবাদ হবে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল ও শালীন।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয়, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বাধা না দেয়। ন্যায়বিচার করো। এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা: ৮)
প্রতিবাদের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়। এর লক্ষ্য অন্যায় দূর করা, অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই একজন মুমিনের প্রতিবাদ হবে দায়িত্বশীল, সংযত ও কল্যাণমুখী।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত শিষ্টাচার মেনে। প্রতিবাদ হবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে, জুলুম প্রতিরোধে এবং মানুষের কল্যাণে। সেখানে ক্রোধের বদলে থাকবে সংযম, প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়বিচার এবং বিশৃঙ্খলার বদলে প্রজ্ঞা ও নিয়মতান্ত্রিকতা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শিষ্টাচার, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ১৪৮; সুরা হুজরাত: ৬; সুরা বাকারা: ১৯০; সহিহ মুসলিম: ৪৯; সহিহ বুখারি: ১০; জামে তিরমিজি: ২১৬৯; সুনানে আবু দাউদ: ৫১৫৩