Dhaka Mail Logo

ইসলাম

নারীর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে অপমান: ইসলাম কী বলে

ধর্ম ডেস্ক

২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ারেও পরিণত হচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো পুরুষকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তার স্ত্রী, বোন, মেয়ে বা অন্য কোনো নারী আত্মীয়ের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবে কারও গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সম্মানহানি ও সামাজিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়। পরিস্থিতিভেদে এতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মানহানি, গিবত ও অপবাদের মতো একাধিক গুনাহ সংঘটিত হতে পারে।

১. মানুষের সম্মান রক্ষা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি

ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান- এই তিনটিকেই পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের মান-সম্মান একে অপরের জন্য ততটাই পবিত্র, যতটা আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি: ১০৫; সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯)

আরও পড়ুন: অন্যের দোষ গোপন রাখার ৬ ফজিলত

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোন নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না।’ (সুরা হুজরাত: ১১)

২. অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন নিষিদ্ধ

কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করা, তার গোপন তথ্য অনুসন্ধান করা কিংবা অনুমতি ছাড়া তা প্রকাশ করা ইসলামে ‘তাজাসসুস’ (গোপনে অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরি) হিসেবে বিবেচিত, যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২)

অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার প্রতিও ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯০)

৩. প্রতিহিংসার শিকার করা যাবে না নিরপরাধ নারীকে

কোনো পুরুষের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও সেই বিরোধের প্রতিশোধ তার পরিবারের নিরপরাধ নারী সদস্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম: ১৬৪; সুরা ইসরা: ১৫)

অর্থাৎ, একজনের কাজের দায় অন্যের ওপর চাপানো যাবে না। তাই কারও প্রতি ক্ষোভ থেকে তার পরিবারের নারীর সম্মানহানি করা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট জুলুম।

আরও পড়ুন: মুমিন নারীর ৭টি মূল্যবান গুণ

৪. অশ্লীলতা ও অপবাদ ছড়ানো থেকে সতর্কতা

কোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সময় তার সম্মানহানি, অপবাদ এবং সমাজে অশ্লীলতা বিস্তারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম অশ্লীলতা ছড়ানো এবং মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো-উভয় বিষয়কেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নূর: ১৯)

আবার আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের তারা যা করেনি তার দায়ে যারা কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব: ৫৮)

এ দুটি আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, মানুষের সম্মানহানি, কুৎসা রটানো এবং অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

৫. অন্যায়ের প্রচারকারীর দায়

কোনো সম্মানহানিকর ছবি বা ভিডিওর জন্য শুধু প্রথম প্রকাশকারীই দায়ী নয়; জেনে-শুনে যারা তা শেয়ার, ফরোয়ার্ড বা ভাইরাল করে, তারাও সেই অন্যায়ের অংশীদার। এ ধরনের কাজ যত বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তত বেশি মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এবং এর দায়ও তত বিস্তৃত হতে থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর- প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা ইসরা: ৩৬)

আরও পড়ুন: ইসলামের দৃষ্টিতে যারা ভালো মানুষ

৬. অন্যের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা

ইসলাম মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা এবং কাউকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন,

‘হে ওইসব লোক, যারা মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলমানদের গিবত করো না এবং তাদের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেবেন। আর আল্লাহ যার গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেবেন, তাকে তিনি তার নিজের ঘরেও লাঞ্ছিত করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৮০; জামে তিরমিজি: ২০৩২)

কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের নারী সদস্যের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে তাঁকে অপদস্থ করার চেষ্টা এই হাদিসের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মুমিনের পরিচয় হলো অন্যের গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা করা, তা নষ্ট করা নয়।

৭. ভুল হয়ে গেলে করণীয়

রাগ, প্রতিহিংসা বা আবেগের বশে কেউ যদি এমন কাজ করে ফেলেন, তাহলে প্রথম কাজ হবে সংশ্লিষ্ট পোস্ট, ছবি বা ভিডিও অবিলম্বে মুছে ফেলা। এরপর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। যেহেতু এতে বান্দার হক জড়িত থাকতে পারে, তাই আল্লাহর কাছে তাওবার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সম্ভব হলে তার ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করাও জরুরি।

আরও পড়ুন: যেসব ত্রুটির কারণে পূর্ণ মুমিন হওয়া যায় না

আইনি দিক

শরয়ি নির্দেশনার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রচলিত সাইবার-সংক্রান্ত আইনেও সম্মতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, প্রচার বা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে থানা বা পুলিশের সাইবার অপরাধ-সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

ভুক্তভোগী হলে কী করবেন

কারও ছবি বা ভিডিও এভাবে ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে নীরব না থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রমাণ যেমন স্ক্রিনশট, লিংক বা সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিপোর্টিং সুবিধা ব্যবহার করে কনটেন্ট অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। পরিবার, সমাজ এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

মোটকথা, কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কোনো নারীর ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা ন্যায়বিচার, গোপনীয়তা ও মানুষের সম্মান রক্ষার ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের সম্মানের মতো অন্যের সম্মানও রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অন্যের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: সুরা হুজরাত; সুরা নূর; সুরা ইসরা; সুরা আনআম; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম