ধর্ম ডেস্ক
১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
সম্প্রতি ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেন নিয়ে পাকিস্তানের করাচির প্রখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া দারুল উলুম করাচির দারুল ইফতা থেকে জারি করা একটি ফতোয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফতোয়াটিতে আধুনিক ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী স্কলার এবং পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়ত কোর্টের সাবেক বিচারপতি মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানীসহ আরও পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আলেমের স্বাক্ষর রয়েছে। পরে মুফতি তাকি উসমানীর পুত্র হাসান উসমানী ফতোয়াটির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
বিটকয়েন (Bitcoin), ইউএসডিটি (USDT) ও অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় এই ফতোয়াটি মুসলিম বিনিয়োগকারী ও ইসলামি অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ফতোয়া দিলেন মুফতি তাকি উসমানী
ফতোয়াটি মূলত একজন ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ক্রিপ্টো টোকেন বা ইউএসডিটি ব্যবহার করে কেনা বই ও ডিজিটাল কোর্স শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ কি না।
জবাবে ফতোয়ায় বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের বর্তমান গবেষণা ও মূল্যায়নের আলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে শরিয়তের পরিভাষায় পূর্ণাঙ্গ ‘মাল’ (সম্পদ) হিসেবে গণ্য করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফতোয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত একটি অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত কিছু সাংখ্যিক রেকর্ড ছাড়া আর কিছু নয়। তাই ফতোয়াটিতে উপস্থাপিত মত অনুযায়ী, এর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া লেনদেন শরিয়তসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফতোয়া অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া লেনদেনে ক্রেতা সংশ্লিষ্ট পণ্যের শরিয়তসম্মত মালিক হন না। ফলে সেই পণ্য ব্যবহার বা অন্যের কাছে বিক্রি করাও শরিয়তসম্মত নয় বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিজিটাল কোর্সের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে, এ ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত কোর্স বা ডিজিটাল উপাদান নিজের ডিভাইস থেকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা উচিত।
যারা মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী ও সহ-স্বাক্ষরকারী আলেমদের এই ফতোয়া অনুসরণ করতে চান, তাদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে-
১. ফতোয়ার পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি বুঝুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংক্ষিপ্ত পোস্ট বা উদ্ধৃতির ওপর নির্ভর না করে ফতোয়ার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য ও এর শরয়ি ভিত্তি বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
আরও পড়ুন: ক্রিপ্টো ব্যবসায় এক বছরে ট্রাম্পের আয় শতকোটি ডলার
২. যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিন
যারা ইতোমধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করেছেন, তারা মূলধন, মুনাফা এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নিজ অনুসৃত কোনো যোগ্য মুফতি বা ইসলামি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।
৩. সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে বিরত থাকুন
ইসলামে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
ক্রিপ্টোকারেন্সির শরয়ি বৈধতা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরেই ইলমি ইখতিলাফ রয়েছে।
মিসরের দারুল ইফতা, তুরস্কের প্রেসিডেন্সি অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স এবং ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ ক্রিপ্টোকারেন্সিকে শরিয়তসম্মত মনে করে না।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার সিকিউরিটিজ কমিশনের শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলসহ কিছু ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কিছু ডিজিটাল সম্পদকে শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ, এ বিষয়ে এখনো মুসলিম বিশ্বে একক কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মোটকথা, শরিয়াহ, অর্থনীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈধতা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। তবে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী ও অন্যান্য আলেমের সাম্প্রতিক এই ফতোয়া বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। যারা ইতোমধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করেছেন বা ভবিষ্যতে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য নিজ অনুসৃত যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই অধিক নিরাপদ বলে অনেক ইসলামি ব্যক্তিত্ব মত দেন।
উৎস: দারুল ইফতা, জামিয়া দারুল উলুম করাচি
স্বাক্ষরকারী: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানীসহ ৬ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম
সত্যতা নিশ্চিত করেছেন: হাসান উসমানী (মুফতি তাকি উসমানীর পুত্র)
মূল বক্তব্য: ফতোয়াটিতে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে শরিয়তের পরিভাষায় পূর্ণাঙ্গ ‘মাল’ হিসেবে গণ্য করার যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি; তাই এর মাধ্যমে সম্পন্ন লেনদেন শরিয়তসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।