ধর্ম ডেস্ক
১৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। দান-সদকা, ত্রাণ বিতরণ কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষের সেবা এসব কাজ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তবে ইখলাস বা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করাই ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত। মানুষের প্রশংসা, প্রচার বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা নেক কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং কোরআন-হাদিসে এ ধরনের আমলের সওয়াব নষ্ট হওয়ার কঠোর সতর্কতা এসেছে।
কোরআন-হাদিসের আলোকে লোক দেখানো আমল বা রিয়া সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো।
‘রিয়া’ শব্দের অর্থ হলো মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো ইবাদত বা নেক কাজ করা, যাতে তারা প্রশংসা করে বা তাকে দানশীল ও ধার্মিক হিসেবে মূল্যায়ন করে। হাদিসে রিয়াকে ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক বলে সতর্ক করা হয়েছে, কারণ এটি ইবাদতের উদ্দেশ্যকে আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের প্রশংসার দিকে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুন্দর কথা ও ক্ষমা সেই দান অপেক্ষা উত্তম, যার পরে (গ্রহীতাকে) কষ্ট দেওয়া হয়।’ (সুরা বাকারা: ২৬৩)
পরের আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা দানকে নষ্ট করো না, সেই ব্যক্তির মতো, যে লোক দেখানোর জন্য তার সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)
এই দুই আয়াত থেকে স্পষ্ট, দানের নিয়ত ও পরবর্তী আচরণ দুটোই সওয়াব রক্ষার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: দানের ভিডিও বানালে কি রিয়া হবে? ইসলামের স্পষ্ট জবাব
রিয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে সবচেয়ে শক্তিশালী সতর্কবার্তা এসেছে সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে। বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে তাদের একজন হবেন সেই ব্যক্তি, যিনি দুনিয়াতে অনেক দান করেছিলেন। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তিনি কী উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। তিনি বলবেন, ‘আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য দান করেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি দান করেছিলে যাতে তোমাকে দানবীর বলা হয়, আর তা বলা হয়েছে।’ এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)
এই হাদিস প্রমাণ করে, বাহ্যিকভাবে বড় আমলও বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
ইসলামে গোপন দানকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভকারী সাত শ্রেণির মানুষের একজন হবেন- ‘যে ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী দান করেছে, বাম হাতও তা জানতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
এ থেকেই বোঝা যায়, দানের ক্ষেত্রে আত্মপ্রচার নয়; বরং আন্তরিকতাই সবচেয়ে মূল্যবান।
আরও পড়ুন: অন্তত একটি আমল গোপন রাখতে পারলে পরকালে যে লাভ হবে
প্রকাশ্যে দান করা কি সবসময় রিয়া? না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তাও ভালো। আর যদি গোপনে দাও এবং অভাবগ্রস্তদের পৌঁছে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)
অর্থাৎ প্রকাশ্য দান নিষিদ্ধ নয়, তবে তার সঙ্গে দুটি শর্ত যুক্ত থাকা জরুরি- নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং গ্রহীতার সম্মান রক্ষা।
নিয়তের দিক থেকে: উদ্দেশ্য যদি হয় কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জবাবদিহি বজায় রাখা বা অন্যদের নেক কাজে উৎসাহিত করা, তাহলে প্রয়োজনীয় সীমায় দান প্রকাশ করা বৈধ। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় আত্মপ্রচার, জনপ্রিয়তা বা মানুষের প্রশংসা অর্জন, তাহলে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে।
গ্রহীতার দিক থেকে: বর্তমানে ত্রাণ বা সাহায্য বিতরণের ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু দাতার নিয়ত শুদ্ধ থাকাই যথেষ্ট নয়; গ্রহীতার সম্মান, গোপনীয়তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি। ছবি বা ভিডিও প্রকাশ যদি গ্রহীতাকে বিব্রত করে বা তার আত্মসম্মানে আঘাত করে, তবে তা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে গ্রহীতার সম্মতি থাকলে, তার পরিচয় গোপন রাখা হলে, কিংবা প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতার স্বার্থে সীমিত পরিসরে তথ্য প্রকাশ করলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।
আরও পড়ুন: যে নিয়ত না করলে ভালো কাজেরও সওয়াব নেই
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। রিয়া মানে ইচ্ছাকৃতভাবে দেখানোর জন্য কাজ করা। কিন্তু কেউ যদি বিশুদ্ধ নিয়তে বা এমনকি গোপনে কোনো নেক কাজ করেন, আর পরে কোনোভাবে তা জানাজানি হয়ে মানুষ তার প্রশংসা করে, তাহলে সেটি রিয়া নয়।
হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ভালো কাজ করে আর মানুষ তার প্রশংসা করলে সে আনন্দিত হয়- এটি কি রিয়া? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি হলো মুমিনের জন্য দ্রুত সুবার্তা (দুনিয়াতে দেওয়া আগাম সুসংবাদ)।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৪২)
অর্থাৎ নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশংসায় আনন্দিত হওয়া দোষের নয়; দোষ তখনই হয়, যখন প্রশংসা পাওয়ার আশাতেই কাজটি করা হয়।
রিয়া একটি সূক্ষ্ম আত্মিক ব্যাধি। এ থেকে বাঁচতে করণীয়-
রাসুলুল্লাহ (স.) রিয়া থেকে আশ্রয় চেয়ে এই দোয়াটি শিক্ষা দিয়েছেন- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা আন উশরিকা বিকা ওআনা আ’লাম ওয়া আস্তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি জ্ঞাতসারে আপনার সাথে শরিক করা থেকে । আর আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি ওই সকল বিষয়ে, যা আমি জানি না।’ (আদাবুল মুফরাদ: ৭২১; সহিহ আল জামে: ৩৭৩১)
দান-সদকা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের অন্যতম বড় মাধ্যম। তাই সাময়িক প্রশংসা, প্রচার বা জনপ্রিয়তার মোহে এই মহান ইবাদতের মর্যাদা নষ্ট করা একজন মুমিনের জন্য সমীচীন নয়। মানুষের করতালি নয়, আল্লাহর দরবারে একটি কবুল হওয়া আমলই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় অর্জন।