ধর্ম ডেস্ক
০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র নগরী মক্কায় যান। ওমরার আনুষ্ঠানিকতা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। যারা ওমরা করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে ৮টি ধাপে তুলে ধরা হলো।
মিকাত (নির্ধারিত সীমা) অতিক্রম করার আগেই পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হবে এবং ওমরার নিয়ত করতে হবে। নিয়তের পর থেকেই ইহরামের বিধান কার্যকর হবে।
ইহরাম অবস্থায় চুল বা নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং স্থলজ বন্য প্রাণী শিকারসহ শরিয়তে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকতে হয়।
নিয়তের পর থেকে পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচু স্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’
তাওয়াফ শুরু হওয়া পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করা সুন্নত।
আরও পড়ুন: নারী-পুরুষের তালবিয়া পাঠের নিয়ম
আদব ও বিনয়ের সঙ্গে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে তাওয়াফের প্রস্তুতি নিতে হবে। ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশের দোয়া পড়া সুন্নত।
হাজরে আসওয়াদ বরাবর থেকে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। পুরুষদের জন্য তাওয়াফের সময় ইজতিবা করা সুন্নত। অর্থাৎ, ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধের ওপর রাখতে হবে, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে। তাওয়াফ শেষ হলে নামাজের আগে কাঁধ ঢেকে নিতে হবে।
সম্ভব হলে প্রতিটি চক্করের শুরুতে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা চুম্বন করা সুন্নত। ভিড়ের কারণে তা সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে তাকবির বলা যায়। একে ইস্তিলাম বলা হয়।
এরপর কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হবে। ভিড় বা অন্যকোনো বাধা না থাকলে পুরুষদের জন্য প্রথম তিন চক্করে রমল (দৃঢ় পদক্ষেপে কিছুটা দ্রুত হাঁটা) করা সুন্নত।
তাওয়াফ শেষে সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহিমের কাছে, অন্যথায় মসজিদুল হারামের যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এই নামাজ ওয়াজিব। প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া উত্তম।

তাওয়াফ-পরবর্তী নামাজের পর তৃপ্তি সহকারে জমজমের পানি পান করে আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও নেক মকসুদ পূরণের জন্য দোয়া করা সুন্নত।
আরও পড়ুন: জমজমের পানি পানের পদ্ধতি ও দোয়া
সাফা থেকে শুরু করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাতবার চলাচল করতে হয়। সাফা থেকে মারওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে সাফা পরবর্তী চক্কর হিসেবে গণ্য হবে।
সাঈ শুরু করার আগে সাফা পাহাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে কুরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করা সুন্নত- ‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ। ফামান হাজ্জাল বাইতা আওই’তামারা ফালা জুনাহা আলাইহি আইয়াত্তাওয়াফা বিহিমা। ওয়ামান তাতাওওয়া খাইরান ফাইন্নাল্লাহা শাকিরুন আলিম।’
অর্থ: নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর হজ বা ওমরা পালন করবে, তার জন্য এ দুটির মাঝে সাঈ করাতে কোনো দোষ নেই। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো ভালো কাজ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ। (সুরা বাকারা: ১৫৮)
পুরুষরা পুরো মাথা মুণ্ডন (হালক) করবেন অথবা সমানভাবে চুল ছোট (তাকসির) করবেন। মাথা মুণ্ডন করা অধিক ফজিলতপূর্ণ।
নারীরা চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙুলের ডগা পরিমাণ (প্রায় এক ইঞ্চি) চুল কেটে নেবেন। এর মাধ্যমে ওমরা সম্পন্ন হবে এবং ইহরামের বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে।
ওমরার কোনো কাজ বাদ পড়লে তার গুরুত্ব ও সমাধান বুঝতে নিচের তালিকাটি সহায়ক হবে-
| বিধানের স্তর | ওমরাহর কাজসমূহ | বাদ পড়লে বা ভুল হলে করণীয় |
| ফরজ (শর্ত ও রুকন) |
১. ইহরাম বাঁধা (ওমরার শর্ত) |
এর যেকোনোটি বাদ পড়লে ওমরা সম্পন্ন হবে না। সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা জরুরি। |
| ওয়াজিব | ১. মিকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম গ্রহণ করা ২. সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা ৩. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা ৪. তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাকাত নামাজ আদায় করা |
ওয়াজিব ত্যাগের বিধান কাজভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাঈ বা হালক-তাকসিরের মতো কিছু ওয়াজিব বাদ পড়লে ‘দম’ ওয়াজিব হতে পারে। তবে তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাকাত নামাজ ছুটে গেলে সাধারণত দম আবশ্যক হয় না। |
| সুন্নত ও মোস্তাহাব | ১. তাওয়াফ শুরু হওয়া পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করা ২. রমল ও ইজতিবা করা (পুরুষদের জন্য) ৩. জমজমের পানি পান করা |
ওমরা আদায় হয়ে যাবে এবং কোনো দম বা কাফফারা লাগবে না। তবে সুন্নত ত্যাগের কারণে অতিরিক্ত সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। |
অজু: তাওয়াফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য অজু থাকা আবশ্যক। অজু ছাড়া তাওয়াফ করলে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ত্রুটি সংশোধনের জন্য ‘দম’ ওয়াজিব হতে পারে। তবে সাঈ করার জন্য অজু শর্ত নয়; অজু অবস্থায় করা উত্তম।
নারীর পর্দা: ইহরাম অবস্থায় নারীরা মুখে নিকাব বা কাপড় স্পর্শ করিয়ে মুখ ঢাকবেন না। তবে পরপুরুষের উপস্থিতিতে মুখের সামনে কাপড় ঝুলিয়ে বা এমনভাবে পর্দা করবেন, যাতে কাপড় সরাসরি মুখ স্পর্শ না করে।
হাজরে আসওয়াদ: ভিড়ের কারণে কালো পাথর স্পর্শ করা সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে তাকবির বলা যায়। অন্য মুসল্লিদের কষ্ট দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শের চেষ্টা করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: কোরআন মজিদ, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আল-হিদায়াহ, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের আলোকে সংকলিত