ধর্ম ডেস্ক
২৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
মাত্র ১ শতাংশ মুসলিমের বসবাস কেপ ভার্দেতে। তবু শত বছরের ঔপনিবেশিক দমন-পীড়ন পেরিয়ে আজ তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, দাওয়াহ, সমাজসেবা ও অর্থনৈতিক অবদানের মাধ্যমে আটলান্টিকের এই দ্বীপরাষ্ট্রে ইসলামের নীরব কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি গড়ে তুলেছেন।
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ভিন্ন এক কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে এই আলোচনার আড়ালে দেশটির আরেকটি নীরব গল্প রয়েছে- কেপ ভার্দেতে ইসলামের ধীরে ধীরে বিকাশের গল্প। সংখ্যায় অল্প হলেও এখানকার মুসলিমরা আজ দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক দমন-পীড়ন পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করে তুলছেন।
আরও পড়ুন: কেপ ভার্দে: আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ এই দেশটি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না
২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। তাঁদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালি থেকে আসা অভিবাসী। রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো, পর্যটননির্ভর সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাঁদের বসবাস বেশি। সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, হোটেল ও পর্যটনসেবা, পরিবহন এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সুফি ধারা- বিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয়।
আরও পড়ুন: পর্তুগালে ইসলাম: আন্দালুসের গৌরব ও সমকালীন মুসলিম
কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে কেপ ভার্দেতে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন পড়ে। ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁদের অনেকেরই ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি ছিল শক্তিশালী। কিন্তু পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অনেক মুসলিম ক্রীতদাসকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয় এবং কোরআন তেলাওয়াত কিংবা প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিক যুগে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি।
তবু ইসলামের সব চিহ্ন মুছে যায়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম সংস্কৃতির কিছু উপাদান আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে দাপ্তরিক পর্তুগিজ ভাষার বাইরেও অভিবাসী মুসলিমদের মাঝে ফরাসি ও ওলোফ ভাষার চর্চা তাদের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ধর্মচর্চার সুযোগ পান। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলো আইনি মর্যাদা ও কর-সুবিধা লাভ করে।
আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মুসলমানরা কেমন আছেন
মুসলিম জনসংখ্যা কম হওয়ায় কেপ ভার্দেতে ধর্মীয় অবকাঠামো এখনো সীমিত। রাজধানী প্রাইয়া, মিনদেলো এবং সাল দ্বীপে কয়েকটি ছোট মসজিদ ও ইবাদতখানায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, রমজানের তারাবি ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীতে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূমি বরাদ্দ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশটিতে বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসা নেই। তবে মসজিদকেন্দ্রিক ছোট ছোট মক্তবে শিশু-কিশোরদের কোরআন তেলাওয়াত ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
কেপ ভার্দের মুসলিমদের প্রধান সংগঠন ‘কম্যুনিদাদে ইসলামিকা দে কাবো ভের্দে’। এ ছাড়া ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা দে দাওয়াহ দে কাবো ভের্দে’ নতুন মুসলিমদের সহায়তা, দাওয়াহ, জাকাত বিতরণ এবং অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির সঙ্গে সৌদি আরবে ইসলামি শিক্ষাপ্রাপ্ত ইমাম ইবরাইমা সিদি ও মুয়াজ্জিন সেকু সুয়ারের মতো ব্যক্তিত্ব যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে স্থানীয় নওমুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত ‘আল ওয়াসিলাহ ফাউন্ডেশন’ মানবিক সেবা ও আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে কাজ করছে।
কেপ ভার্দে আফ্রিকার অন্যতম শান্তিপূর্ণ দেশ। এখানকার মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সম্পর্কও বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ। ২০২২ সালে ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে ইকোওয়াস সম্মেলনের আয়োজন দেশটির আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরই প্রতিফলন। ঈদুল আজহা বা ‘তাবাস্কি’র সময় অনেক মুসলিম পরিবার খ্রিস্টান প্রতিবেশীদের মধ্যেও কোরবানির মাংস বিতরণ করেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কেপ ভার্দে যেমন আটলান্টিকের সেতু হিসেবে পরিচিত, তেমনি এখানকার মুসলিমরা আফ্রিকা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির মাঝে একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরির সম্ভাবনা রাখছে।
অধিকাংশ মুসলিম অভিবাসী হওয়ায় আবাসিক অনুমতি ও বৈধ কাগজপত্রসংক্রান্ত জটিলতা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ক্ষুদ্র মুসলিম জনসংখ্যার কারণে অনেক এলাকায় হালাল খাদ্যের প্রাপ্যতা সীমিত। তবে ইতিবাচক দিক হলো, কেপ ভার্দেতে ধর্মীয় উগ্রবাদের কোনো রেকর্ড নেই। মুসলিমরা বরাবরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জীবনধারাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
কেপ ভার্দের মুসলিমরা সংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্র একটি সম্প্রদায়। কিন্তু তাদের ইতিহাস সংগ্রামের, বর্তমান ধৈর্যের এবং ভবিষ্যৎ আশাবাদের। দাসবাণিজ্যের অন্ধকার অধ্যায় থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক দমন-পীড়ন পেরিয়ে ইসলাম আজ কেপ ভার্দের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি স্বীকৃত অংশে পরিণত হয়েছে। আটলান্টিকের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে ইসলামের এই নীরব পদচারণাই দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও মহিমান্বিত করছে।
তথ্যসূত্র: কেপ ভার্দে জাতীয় আদমশুমারি ২০২১, পশ্চিম আফ্রিকান অর্থনৈতিক (ইকোওয়াস) প্রতিবেদন, স্থানীয় ইসলামি সংগঠনের তথ্য