ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম
স্কটল্যান্ডের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মনোরম পাহাড়, হ্রদ, প্রাচীন দুর্গ ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস। তবে অনেকেরই অজানা, ইউরোপের এই দেশটিতে ইসলামও ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। সংখ্যার বিচারে মুসলমানরা এখনও সংখ্যালঘু হলেও তাদের জনসংখ্যা, সামাজিক উপস্থিতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২২ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, স্কটল্যান্ডে মুসলমানের সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৭২ জন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.২ শতাংশ। ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০০১ সালে ছিল মাত্র ৪২ হাজার ৫৫৭ জন। অর্থাৎ দুই দশকে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্কটল্যান্ডে মুসলমানদের উপস্থিতির ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর বেশি পুরোনো। নাম-পরিচয় জানা প্রথম মুসলমান ছিলেন ভারতের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের বাসিন্দা ওয়াজির বেগ। তিনি ১৮৫৮-৫৯ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন।
আরও পড়ুন: ইউরোপে মুসলিম তরুণদের ইসলামপ্রীতি: বৈষম্যের মধ্যেও বাড়ছে ধর্মচর্চা
উনিশ শতকে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহর ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান পাটশিল্পকেন্দ্র। সে সময় অবিভক্ত বাংলা থেকে পাট আমদানি করা হতো এবং ডান্ডি বন্দরে বাঙালি নাবিকদেরও যাতায়াত ছিল। ফলে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলার যোগাযোগের ইতিহাসও বেশ পুরোনো।
পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের মাধ্যমে বর্তমান স্কটিশ মুসলিম সমাজের বড় অংশ গড়ে ওঠে।
স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনপদ গ্লাসগো শহরে, যেখানে প্রায় ৪৯ হাজার মুসলমান বসবাস করেন এবং মোট জনসংখ্যার ৭.৯ শতাংশ মুসলিম। শহরের পলকশিল্ডস এলাকায় এই হার আরও বেশি; প্রায় ২৭.৮ শতাংশ। এডিনবরায় মুসলমানের সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। স্কটল্যান্ডের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশই গ্লাসগো ও এডিনবরা এই দুই শহরে বসবাস করেন।
স্কটল্যান্ডের মুসলিম সমাজ জাতিগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতরা সবচেয়ে বেশি, মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ। এছাড়া আরব ১৪.৫ শতাংশ, আফ্রিকান ৮.৮ শতাংশ এবং বাংলাদেশি ৪.৭ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য যে, দুই হাজারেরও বেশি স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ স্কটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
এ বৈচিত্র্য স্কটল্যান্ডের মুসলিম সমাজকে একটি অনন্য বহুসাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসলামফোবিয়া: ঘৃণা ও বৈষম্যের এক বিশ্বব্যাপী সংকট
২০১১ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কটিশ মুসলমানরা জাতীয় গড়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। যেখানে সাধারণ স্কটিশদের ২৭.১ শতাংশের ডিগ্রি লেভেল শিক্ষা ছিল, সেখানে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৭.৫ শতাংশ।
একই সমীক্ষায় দেখা যায়, পূর্ণকালীন কর্মরত মুসলমানদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্বনির্ভর ব্যবসায়ী ছিলেন, যেখানে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১২ শতাংশ।
রাজনীতিতেও মুসলমানরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। হামজা ইউসুফ দেশটির ফার্স্ট মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েছিলেন। লেবার পার্টির নেতা আনাস সারওয়ারও একজন মুসলিম। এছাড়া জারা মোহাম্মদ মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের প্রথম নারী ও কনিষ্ঠতম সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্কটিশ ঐতিহ্যের সঙ্গে ইসলামের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ‘ইসলামিক টারটান’ নামে একটি বিশেষ চেক নকশা অনুমোদিত হয়েছে, যা স্কটিশ মুসলিমদের নিজস্ব পরিচয়ের অনন্য প্রতীক।
জনপ্রিয় একটি মত অনুযায়ী, ব্রিটেনের বহুল পরিচিত খাবার ‘চিকেন টিক্কা মাসালা’র উৎপত্তি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। এ খাবারের জনপ্রিয়তার পেছনেও দক্ষিণ এশীয় মুসলিম রন্ধনশিল্পীদের অবদান উল্লেখ করা হয়।
স্কটল্যান্ডের সাম্প্রতিক আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ নিজেদের কোনো ধর্মের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন না। এমন একটি সমাজে মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ ধরে রেখে জীবনযাপন করছেন এবং একই সঙ্গে জাতীয় জীবনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
২০১১ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্কটল্যান্ডের প্রায় ৭১ শতাংশ মুসলিম নিজেদের ‘স্কটিশ’ বা ‘ব্রিটিশ’ পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একই সমীক্ষায় দেখা যায়, স্কটিশ মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি ভাষাজ্ঞানও উচ্চমাত্রার। আদমশুমারির বিশ্লেষণে মুসলমানদের মধ্যে স্কটল্যান্ড এবং সামগ্রিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রতি একটি শক্তিশালী একাত্মতা ও সম্পৃক্ততার অনুভূতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা এখনও স্কটল্যান্ডে সংখ্যালঘু। তবে তাদের জনসংখ্যাগত বৃদ্ধি, সামাজিক অবদান এবং সাংস্কৃতিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
দেড় শতাব্দীরও বেশি আগে একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পথচলা আজ স্কটল্যান্ডে একটি প্রাণবন্ত, বৈচিত্র্যময় ও ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজে রূপ নিয়েছে। এই সমাজ শুধু নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ই সংরক্ষণ করছে না, একইসঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রেখে স্কটল্যান্ডের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকেও সমৃদ্ধ করছে।
তথ্যসূত্র: স্কটল্যান্ডের ২০২২ সালের আদমশুমারি, মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) এবং উইকিপিডিয়ার ‘স্কটল্যান্ডে ইসলাম’ নিবন্ধ