ধর্ম ডেস্ক
১৭ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আর এই ফরজ ইবাদতকে আরও সমৃদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য করতে ফরজের আগে-পরের সুন্নত নামাজের ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (স.) প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নত নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত আদায় করতেন, যা শরিয়তের পরিভাষায় ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদা’ নামে পরিচিত। ওজর বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নবীজি (স.) এই নামাজগুলো কখনো ছাড়তেন না।
বর্তমানে অনেক মুসল্লি ফরজ নামাজ আদায় করলেও এর আগে-পরের এই সুন্নতগুলোর প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। অথচ এসব নামাজের ব্যাপারে নবীজি (স.)-এর আমল, উৎসাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্বারোপ ছিল অনেক বেশি।
উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে ১২ রাকাত (সুন্নতে মুয়াক্কাদা) নামাজ পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৭২৮; জামে তিরমিজি: ৪১৫)
১. ফজরের ফরজের আগে: ২ রাকাত।
২. জোহরের ফরজের আগে: ৪ রাকাত।
৩. জোহরের ফরজের পরে: ২ রাকাত।
৪. মাগরিবের ফরজের পরে: ২ রাকাত।
৫. এশার ফরজের পরে: ২ রাকাত।
আরও পড়ুন: সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
পাঁচ ওয়াক্তের সুন্নতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফজরের দুই রাকাত সুন্নত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (স.) নফল নামাজগুলোর মধ্যে কোনো নামাজের প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন না, যতটা গুরুত্ব দিতেন ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের প্রতি।’ (সহিহ বুখারি: ১১৬৯) নবীজি (স.) বলেছেন, ‘ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম: ৭২৫)
জোহরের আগে চার রাকাত এবং পরে দুই রাকাত সুন্নত আদায় করা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিয়মিত আমল ছিল। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবী (স.) জোহরের আগে চার রাকাত নামাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না।’ (সহিহ বুখারি: ১১৮২)
মাগরিব ও এশার ফরজ নামাজের পর দুই রাকাত করে সুন্নত আদায় করাও নবীজি (স.)-এর অপরিবর্তনীয় আমলের অন্তর্ভুক্ত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘নবী (স.) হতে আমি ১০ রাকাত সালাত আমার স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে রেখেছি। জোহরের পূর্বে দু’রাকাত পরে দু’রাকাত, মাগরিবের পরে দু’রাকাত তাঁর ঘরে, এশার পরে দু’রাকাত তাঁর ঘরে এবং দু’রাকাত সকালের (ফজরের) সালাতের পূর্বে।’ (সহিহ বুখারি: ১১৮০)
আরও পড়ুন: ফজর-আছর-এশা নামাজের বিশেষত্ব
সুন্নত মূলত ওইসব আমলকে বলা হয়, যা ফরজ বা ওয়াজিবের মতো অপরিহার্য না হলেও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিয়মিত আমল থেকে প্রমাণিত। নবীজি (স.) যে সুন্নতগুলো ওজর ছাড়া কখনো ছাড়তেন না, সেগুলোকে ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদা’ বলা হয়। ফকিহগণের মতে, এটি মর্যাদার দিক থেকে ওয়াজিবের কাছাকাছি। কোনো ওজর ছাড়া নিয়মিত এই সুন্নতগুলো ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ। এ ধরনের সুন্নত ত্যাগকারীকে তিরস্কার করা হবে। (তথ্যসূত্র: আত-তাআরিফাতুল ফিকহিয়্যাহ: ৩২৮, আল-মুজিজ ফি উসুলিল ফিকহ: ৪৩৯-৪০)
ফরজ নামাজে অনেক সময় আমাদের মনোযোগে বিচ্যুতি ঘটে বা ছোটখাটো ভুল হয়। কেয়ামতের দিন এই ঘাটতি পূরণের প্রধান মাধ্যম হবে ফরজের আগে-পরের এই সুন্নতগুলো। রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, হাশরের ময়দানে বান্দার ফরজ নামাজের হিসাবে কমতি দেখা দিলে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন- ‘দেখো, আমার বান্দার কোনো নফল (বা সুন্নত) নামাজ আছে কি না? যদি থাকে, তবে তা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৮৬৪; জামে তিরমিজি: ৪১৩)
ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক মুসলমান ফরজ নামাজ আদায় করেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন দেখায়, ফরজের পাশাপাশি সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজও একজন মুমিনের দৈনন্দিন ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাত্র ১২ রাকাত সুন্নত নামাজের বিনিময়ে জান্নাতে রাজপ্রাসাদ পাওয়ার এই অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করা মুমিনের কাজ হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের নবীজি (স.)-এর এই সুন্নাহগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।