images

ইসলাম

আপনার বয়ানের পর উম্মাহ কি ঐক্যবদ্ধ হয়, নাকি বিভক্ত?

ধর্ম ডেস্ক

১৬ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

প্রতিদিন হাজার হাজার বয়ান হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ ভিউ পড়ছে। তবু মুসলমান কেন আরও বিভক্ত হচ্ছে? প্রশ্নটা আর এড়িয়ে যাওয়ার সময় নেই। মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় শক্তি হলো ঐক্য। কোরআন ও সুন্নাহ বারবার মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ঐক্য রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে ধর্মীয় আলোচনা, ওয়াজ-মাহফিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত নানা বয়ানের প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে- আমাদের বক্তব্য কি উম্মাহকে আরও কাছাকাছি আনছে, নাকি দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

একজন আলেম, দাঈ বা খতিবের দায়িত্ব মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা এবং উম্মাহর মধ্যে কল্যাণকর পরিবেশ গড়ে তোলা। তাই প্রত্যেক বক্তার জন্য আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে- ‌‌‘আমার বয়ানের পর মানুষ কি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, নাকি পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়?’

ইসলামের দৃষ্টিতে ঐক্যের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)
অন্য আয়াতে তিনি আরও কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন- وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ‘তোমরা ঝগড়া-বিবাদ করো না। তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে।’ (সুরা আনফাল: ৪৬) এ আয়াতদ্বয় থেকে স্পষ্ট- মুসলিম উম্মাহর শক্তি নিহিত রয়েছে ঐক্যে; আর বিভক্তি তাদের দুর্বল করে দেয়।

আরও পড়ুন: ঐক্যহীন মুসলিম উম্মাহ: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা

রাসুলুল্লাহ (স.)-ও উম্মাহর ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন- إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا: أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয়ে সন্তুষ্ট হন- তোমরা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না; তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে এবং বিভক্ত হবে না’ (সহিহ মুসলিম: ১৭১৫) এই হাদিস থেকে উম্মাহর ঐক্যের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

হক কথা বলার পাশাপাশি প্রয়োজন হিকমত

ইসলাম মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে সেই আহ্বান হতে হবে প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর পদ্ধতিতে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ‘তোমার রবের পথে মানুষকে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে এমন পদ্ধতিতে আলোচনা করো, যা সর্বোত্তম।’ (সুরা নাহল: ১২৫) আল্লাহ এখানে তিনটি শর্ত দিয়েছেন- হিকমত, উত্তম উপদেশ এবং সর্বোত্তম পদ্ধতি। দাওয়াতের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য হিকমত, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর পদ্ধতির সমন্বয় অপরিহার্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যে জিনিসে থাকে তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, আর যে জিনিস থেকে তা সরিয়ে নেওয়া হয় তাকে ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম) সত্য কথা বলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা বলার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই কথা কখনো মানুষের হৃদয় জয় করে, আবার কখনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

‘মতভেদ ও বিভক্তি’ দুটি ভিন্ন বিষয়

ইসলামের ইতিহাসে ফিকহি ও ইজতিহাদি বিষয়ে মতভেদ ছিল এবং থাকবে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের ইমামদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে। কিন্তু সে মতভেদ তাঁদের পারস্পরিক সম্মান, ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। চার মাজহাবের ইমামদের জীবনই এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁরা বহু মাসয়ালায় ভিন্নমত পোষণ করলেও একে অপরের ইলম, তাকওয়া ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন। মতভেদ তাঁদের প্রতিপক্ষ বানায়নি; বরং ইলমি আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে।

আরও পড়ুন: মুসলিম উম্মাহ আজ বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কবলে: শায়খ আহমাদুল্লাহর উদ্বেগ

ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলতেন, ‘আমার মতামত সঠিক হতে পারে, তবে ভুলের সম্ভাবনাও আছে; আর অন্যের মতামত ভুল হতে পারে, তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।’ এই বিনয় ও হৃদয়ের প্রশস্ততাই ছিল সলফে সালেহিনের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং মতভেদ থাকা এবং বিভক্তি সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। মতভেদ জ্ঞানচর্চার অংশ হতে পারে, কিন্তু বিদ্বেষ, কটূক্তি ও পারস্পরিক ঘৃণা কখনো কাম্য নয়।

একজন বক্তার আত্মসমালোচনা

প্রত্যেক বয়ান, খুতবা বা আলোচনার আগে এবং পরে একজন আলেম বা দাঈ নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখতে পারেন। আমার বক্তব্য কি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে, নাকি পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে? আমার কথার ফলে কি মুসলমানদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, নাকি সন্দেহ ও ঘৃণা বাড়ছে? আমি কি সমাধান তুলে ধরছি, নাকি শুধু সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছি? আমার বয়ানের ফলে কি দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে, নাকি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বাড়ছে? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই নিহিত আছে একজন দায়িত্বশীল আলেম বা দাঈর আত্মসচেতনতার মূল মানদণ্ড।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا، وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ‘যে ব্যক্তি হেদায়েতের দিকে আহ্বান করে, সে তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; এতে তাদের সওয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না। আর যে ব্যক্তি বিভ্রান্তির দিকে আহ্বান করে, তার ওপর তার অনুসারীদের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে; এতে তাদের গুনাহেরও কোনো ঘাটতি হবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৭৪) এই হাদিস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষকে কল্যাণ বা অকল্যাণের দিকে আহ্বান করার দায় ও পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর।’

ভারসাম্যপূর্ণ আলেম কেন আজ অপরিহার্য?

বর্তমান সময়ে উম্মাহর প্রয়োজন এমন আলেম ও দাঈ, যারা কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সত্য কথা বলবেন ইনসাফ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে। তারা অবশ্যই ভুলের সংশোধন করবেন, তবে অপমান বা বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়। যারা মতভেদের বাস্তবতা স্বীকার করবেন, কিন্তু বিভেদের পথ প্রশস্ত করবেন না। এ ধরনের আলেমরা মানুষকে শেখান যে দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় থাকা এবং ইজতিহাদি বিষয়ে সহনশীলতা প্রদর্শন করা উভয়ই ইসলামের শিক্ষার অংশ।

আরও পড়ুন: মুসলিম উম্মাহর সমস্যার মূল নিজেদের পরিচয় ভুলে যাওয়া

আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ অর্থ: ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমগণই তাঁকে যথার্থভাবে ভয় করেন।’ (সুরা ফাতির: ২৮) এই আয়াতে আলেমের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর ভয়। বিতর্কের দক্ষতা নয়, অনুসরণকারীর সংখ্যা নয়, ভিউয়ের পরিমাণ নয়। আল্লাহভীতি একজন আলেমকে উম্মাহর কল্যাণ, ঐক্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রক্ষায় আরও সতর্ক করে তোলে।

রাসুলুল্লাহ (স.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন— تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى ‘মুমিনদের পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার উদাহরণ একটি দেহের মতো; যখন তার একটি অঙ্গ ব্যথিত হয়, তখন পুরো দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১১) এই হাদিস থেকে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও ঐক্যের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

একজন আলেম বা বক্তার প্রকৃত সাফল্য হলো তাঁর বক্তব্য মানুষের ঈমান, আমল, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহভীতিকে কতটা বৃদ্ধি করল। তাই প্রত্যেক দাঈ, খতিব ও আলেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার প্রশ্ন হতে পারে- ‘আমার বয়ানের পর উম্মাহ কি ঐক্যবদ্ধ হয়, নাকি বিভক্ত?’ ইতিহাস সেই আলেমকেই স্মরণ করবে, যাঁর বয়ানের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরেছিল এবং উম্মাহ আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।