মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ঐক্যহীন মুসলিম উম্মাহ: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ঐক্যহীন মুসলিম উম্মাহ: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা

একটি জাতির প্রকৃত শক্তি কেবল জনসংখ্যা, অর্থনীতি বা সামরিক ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার আসল শক্তি নিহিত থাকে ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিক সংহতির মধ্যে। ইসলামে ঐক্য কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি ঈমানের অপরিহার্য দাবি। ইতিহাস সাক্ষী, ঐক্যহীন জাতি শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; হারিয়েছে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন। অনৈক্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত কঠোর।

ঐক্য রক্ষায় কোরআনের নির্দেশ

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (দ্বীন) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৩)। এখানে ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের সামগ্রিক আদর্শকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ আরও সতর্ক করেছেন- ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা স্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিভক্ত হয়েছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৫)

সুরা আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতে বিভক্তির কৌশলগত পরিণতির কথা বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর বিবাদ করো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।’ এখানে ‘শক্তি’ বলতে শুধু বাহ্যিক সামর্থ্য নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর বিশেষ সাহায্যকেও বোঝানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: মুসলিম উম্মাহর দুর্দশায় উদাসীনরা মুমিন নয়: শায়খ সুদাইস

হাদিসের আলোকে অনৈক্যের বিপদ

রাসুলুল্লাহ (স.) মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ককে একটি জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন- ‘মুমিনরা এক দেহের মতো; কোনো অংশ ব্যথিত হলে পুরো দেহ কষ্টে ভোগে।’ (সহিহ বুখারি)। তিনি আরও সতর্ক করেছেন- ‘নেকড়ে কেবল দলছুট ভেড়াকেই আক্রমণ করে। সুতরাং জামাতবদ্ধ হয়ে থাকো।’ (সুনানে আবু দাউদ)। অন্য এক বর্ণনায় নবীজি (স.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে ইসলামের বন্ধন নিজ হাতে খুলে ফেলে।’ (সুনানে আবু দাউদ)

ইতিহাসের আয়নায় অনৈক্যের ধ্বংস

ইতিহাস প্রমাণ দেয়, বাইরের শত্রুর আক্রমণ নয়, ভেতরের বিভাজনই মুসলিমদের পতনের প্রধান কারণ। আন্দালুস বা মুসলিম স্পেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ। সভ্যতার শিখরে থাকা আন্দালুস যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘তাইফা’ রাজ্যে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াইতে লিপ্ত হলো, তখনই তার পতন ত্বরান্বিত হলো। বাগদাদের পতনও একই কথা বলে। আব্বাসীয় খিলাফতের শেষ সময়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই মোঙ্গল বাহিনীর জন্য বাগদাদের দরজা খুলে দিয়েছিল। উসমানীয় খিলাফতের শেষ শতাব্দীতেও জাতীয়তাবাদী বিভাজন সাম্রাজ্যকে খণ্ডিত করেছিল। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট- বাইরের শত্রু শেষ আঘাত করে, কিন্তু ভেতরের ফাটলই ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়।

আরও পড়ুন: অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ফরজ দায়িত্ব

শয়তানের কৌশল

কোরআনে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায়।’ (সুরা মায়েদা: ৯১) শয়তানের এই কৌশল সূক্ষ্ম ও ধাপে ধাপে কাজ করে। একটি বিভক্ত সমাজে শত্রুর বড় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; গুজব, সন্দেহ, আত্মগর্ব ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থের উসকানিই সেখানে ধ্বংস ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

ঐক্য প্রতিষ্ঠার ইসলামিক পথ

ইসলাম অনৈক্যের নিন্দা করার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বাস্তবসম্মত পথও দেখিয়েছে। যেমন-
১. কেন্দ্রীভূত আনুগত্য: আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশনার প্রতি অবিচল থাকা। (সুরা নিসা: ৫৯)
২. পারস্পরিক পরামর্শ: গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে ‘শুরা’ বা পরামর্শের প্রথা বজায় রাখা। (সুরা শুরা: ৩৮)
৩. ধৈর্য ও সত্যনিষ্ঠা: ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে সত্যের পথে অটল থাকা (সুরা আসর)

মনে রাখতে হবে, ঐক্য মানে সকল মতের একরূপ হওয়া নয়; বরং ইজতিহাদি বা জ্ঞানগত মতভেদ থাকা সত্ত্বেও মৌলিক বিষয়ে এক থাকা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা।

কোরআন-হাদিসের দলিল ও ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা অনুযায়ী, অনৈক্য মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মারাত্মক ব্যাধি। এর একমাত্র প্রতিকার হলো কোরআন-সুন্নাহর আলোকে অটুট ভ্রাতৃত্ব গঠন। বর্তমান চ্যালেঞ্জপূর্ণ বিশ্বে এই ঐক্যই আমাদের শক্তি, মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র নিশ্চয়তা। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরগুলোকে ঐক্যের পবিত্র বন্ধনে জুড়ে দিন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর