images

ইসলাম

অপরাধী যদি ক্ষমতাবান হয়, ইসলাম কী নির্দেশ দেয়?

ধর্ম ডেস্ক

১৪ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যেখানে ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি যত প্রভাবশালী, ধনী বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন, অপরাধ করলে তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে- এটাই ইসলামের শিক্ষা। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে পক্ষপাত নিষিদ্ধ

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হয়ে যাও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতারূপে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর।’ (সুরা মায়েদা: ৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)
অর্থাৎ শত্রু হোক বা বন্ধু, ক্ষমতাবান হোক বা দুর্বল সবার জন্য একই বিচারনীতি প্রযোজ্য।

আরও পড়ুন: কেমন ন্যায়বিচারের কথা বলে ইসলাম

ক্ষমতাবানদের ছাড় দেওয়াকে রাসুল (স.) ধ্বংসের কারণ বলেছেন

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের বিরুদ্ধে ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃষ্টান্তগুলোর একটি হলো বনু মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারীর চুরির ঘটনা। কুরাইশ নেতারা চেয়েছিলেন, তার সামাজিক মর্যাদার কারণে শাস্তি মওকুফ করা হোক। এ উদ্দেশ্যে তারা প্রিয় সাহাবি উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-কে সুপারিশের জন্য পাঠান। এ সময় রাসুলুল্লাহ (স.) অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেন- ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ কারণে ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করা হতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস ইসলামের ন্যায়বিচারের অন্যতম শক্তিশালী দলিল। এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি নয়, অপরাধই বিবেচ্য।

সাহাবাদের যুগে আইনের শাসন

খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে খলিফাগণ নিজেরাও আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।
মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)-এর পুত্র এক সাধারণ মিসরীয় নাগরিককে অন্যায়ভাবে আঘাত করেছিলেন। খলিফা ওমর (রা.) সেই নাগরিককে ডেকে গভর্নরপুত্রের বিরুদ্ধে কিসাস গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইতিহাসে একটি বিখ্যাত উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে- ‘কবে থেকে তোমরা মানুষকে গোলাম বানিয়ে রাখলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছিল?’
খলিফা আলী (রা.)-এর একটি বর্ম হারিয়ে গেলে তা এক ইহুদির কাছে পাওয়া যায়। খলিফা হওয়া সত্ত্বেও তিনি জোর করে সেটি না নিয়ে বিচারক শুরাইহের আদালতে মামলা করেন। পর্যাপ্ত সাক্ষী না থাকায় বিচারক খলিফার বিপক্ষে রায় দেন। ইসলামের এই ন্যায়বিচার দেখে সেই ইহুদি ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন: নবীজির যুগে অপরাধীদের যেভাবে গ্রেফতার করা হত

জালিমকে সাহায্য করা যাবে না

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা জালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না; অন্যথায় আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ: ১১৩)
তাফসিরবিদরা বলেন, জালিমের অন্যায়কে সমর্থন করা, তার অপরাধ আড়াল করা বা অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জালিমকে এবং মজলুমকে উভয়কেই সাহায্য করো।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম, জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, ‘তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখবে। এটিই তাকে সাহায্য করা।’ (সহিহ বুখারি)
দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদ্দেশে রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন, ‘যে আমার উম্মতের ওপর কোনো দায়িত্ব লাভ করে এবং তাদের কষ্ট দেয়, হে আল্লাহ! তুমি তাকে কষ্ট দাও; আর যে তাদের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করে, হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করো।’ (সহিহ মুসলিম)

মুসলমানের করণীয় কী?

কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি অপরাধ করলে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে সমর্থন না করা; অপরাধীকে তার প্রভাব, সম্পদ বা পরিচয়ের কারণে রক্ষা না করা; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা; জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বিচার ও সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত থাকা।

ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য। ব্যক্তি যত ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী বা সম্মানিতই হোক না কেন, অন্যায় করলে তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে জাতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে, সেই জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে; স্বয়ং রাসুল (স.) এই সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন। তাই কোনো অপরাধীকে তার ক্ষমতা বা প্রভাবের কারণে রক্ষা না করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই একজন মুসলমানের কর্তব্য। ইসলামের শিক্ষা হলো- ধনী-গরিব, শাসক-প্রজা, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার জন্য একই বিচারনীতি প্রযোজ্য। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।