images

ইসলাম

ভালো রোজগার করেও কেন বরকত থাকে না? কোরআন-হাদিসের আলোকে ১০ কারণ

ধর্ম ডেস্ক

১০ জুন ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

অনেকের আয়-রোজগার ভালো হলেও সংসারে স্বচ্ছলতা আসে না, হাতে টাকা জমে না কিংবা সম্পদে প্রত্যাশিত কল্যাণ ও প্রশান্তি অনুভূত হয় না। ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের প্রকৃত উপকারিতা পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আল্লাহ তাআলার দেওয়া বরকতের ওপর।

ইসলামে ‘বরকত’ বলতে বোঝায় কোনো জিনিসে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ কল্যাণ, স্থায়িত্ব ও উপকারিতা দান করা। সম্পদ কম হলেও বরকত থাকলে তা মানুষের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হয়। পক্ষান্তরে বিপুল সম্পদও বরকতহীন হলে তার প্রকৃত সুফল পাওয়া যায় না। নিচে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত এমন ১০টি কারণ তুলে ধরা হলো, যা সম্পদের বরকত হ্রাসের কারণ হতে পারে-

১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করা

মহান আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে মানুষ তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে জেনে রাখো, আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)

২. পাপাচারে লিপ্ত থাকা

গুনাহ ও আল্লাহর অবাধ্যতা মানুষের জীবন থেকে কল্যাণ ও বরকত দূর হওয়ার কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আরাফ: ৯৬)

আরও পড়ুন: গুনাহের পর অনুতপ্ত মনে ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলত

৩. হারাম উপায়ে সম্পদ অর্জন

অন্যায় ও হারাম পথে উপার্জিত সম্পদ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হয় না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)

৪. প্রতারণা ও ধোঁকা

ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে প্রতারণা বরকত নষ্ট করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতা যতক্ষণ পৃথক না হবে, ততক্ষণ তাদের ইখতিয়ার থাকবে (ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা বা বাতিল করা)। তারা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের ত্রুটি স্পষ্ট করে, তাহলে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হবে। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং ত্রুটি গোপন করে, তাদের বেচাকেনার বরকত মুছে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)

৫. বেশি বেশি কসম খাওয়া

ব্যবসায় বা কথাবার্তায় অহেতুক বেশি শপথ করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কসম পণ্য বিক্রি করতে সাহায্য করলেও বরকত মুছে দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ২০৮৭)

আরও পড়ুন: মা-বাবার নামে শপথ করা কি জায়েজ?

৬. সুদের আদান-প্রদান

সুদকে অনেকেই সম্পদ বৃদ্ধির উপায় মনে করলেও কোরআনে একে বরকত ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিঃশেষ করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৬)

৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা রিজিক বৃদ্ধি ও জীবনে কল্যাণের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)

৮. ইস্তেগফার থেকে দূরে থাকা

আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা জীবিকা বৃদ্ধি ও কল্যাণ লাভের অন্যতম মাধ্যম। হজরত নূহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে।’ (সুরা নূহ: ১০-১২)

আরও পড়ুন: ৭টি ছোট ইস্তেগফার: কোরআন-হাদিসে ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়াগুলো

৯. অপচয় ও অপব্যয়

অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক ব্যয় ইসলামে নিন্দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)

১০. জাকাত আদায় না করা

জাকাত সম্পদের হক এবং ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। জাকাত আদায় করলে সম্পদ পবিত্র হয় এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যখন কোনো জাতি জাকাত আদায় করে না, তখন তাদের জন্য আকাশের বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি পশুপাখি না থাকত, তবে তাদের ওপর আর বৃষ্টিও বর্ষিত হতো না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)

মনে রাখতে হবে, সম্পদের প্রকৃত প্রাচুর্য আল্লাহর দেওয়া বরকতে নিহিত। জীবনের প্রকৃত স্বচ্ছলতা নির্ভর করে হালাল উপার্জন, আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় এবং সম্পদের হক যথাযথভাবে আদায়ের ওপর। তাই একজন মুমিনের উচিত বরকতহীনতার কারণগুলো থেকে দূরে থাকা এবং এমন আমলগুলো আঁকড়ে ধরা, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের মাধ্যম। 

আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবিকা, সম্পদ, সময় ও কর্মে বরকত দান করুন। আমিন।