ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৫ মে ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
মুসলিম উম্মাহ যখন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার অপেক্ষায়, তখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বইছে এক নিদারুণ বিষণ্ণতার হাওয়া। ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলা, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ আর বাস্তুচ্যুতির ক্ষত নিয়ে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানিহীন এক নিস্তেজ ঈদের সামনে গাজাবাসী। যে জনপদে একসময় কোরবানির পশুর হাঁকডাক শোনা যেত, সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর নীরবতা।
গাজা সিটির মাজেন আল-জেরজাভি একসময় ছিলেন এই অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ গবাদিপশু খামারি। ঈদের এই দিনগুলোতে তার ব্যস্ততা থাকত আকাশচুম্বী; নিজের খামার থেকে বিক্রি করতেন শত শত ভেড়া ও গরু। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসলীলা সেই সমৃদ্ধি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। মাজেন এখন একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্মৃতিচারণ করে মাজেন বলেন, ‘ঈদের এই মৌসুমে আমি অন্তত ২০০টি পশু বিক্রি করতাম। আজ আমার গোয়াল শূন্য। গাজায় এখন জীবিত কোনো পশু ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ইসরায়েল আমাদের সাথে এমন আচরণ করছে যেন আমরা এখানে কেবল কয়েক দিনের অতিথি।’
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ৩০০ যুগলের গণবিয়ে
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় গাজার পশুপালন খাতের ৯০ শতাংশ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, গাজার কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া-ছাগল ছিল, এখন সেখানে টিকে আছে মাত্র ৩ হাজার।’
পশুর এই চরম সংকটে বাজার এখন সাধারণ মানুষের নাগালের যোজন যোজন দূরে। যুদ্ধের আগে যে ভেড়া ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারে পাওয়া যেত, বর্তমানে তার দাম উঠেছে অবিশ্বাস্য ৭ হাজার ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ লাখ টাকা)। মাজেন আক্ষেপ করে বলেন, “একটি ভেড়ার পেছনে ২০ হাজার শেকেল খরচ করার চেয়ে এই টাকায় একটি দম্পতির বিয়ের ব্যবস্থা করাও সম্ভব।”
পশুদের টিকিয়ে রাখতে খামারিরা সাধ্যের অতীত চেষ্টা করেছেন। পশুখাদ্যের অভাবে এক পর্যায়ে পশুদের পাস্তা পর্যন্ত খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু বোমাবর্ষণ আর বারবার উচ্ছেদের নির্দেশে শেষ রক্ষা হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, গত এক বছরে গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল হয় মারা গেছে, না হয় হারিয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে খামার, পশুখাদ্যের গুদাম ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনি শিশুদের অপহরণ করে হত্যা করছে ইসরায়েল
গাজাবাসীর কাছে ঈদ এখন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র। স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, ‘মনে হচ্ছে তিন বছর ধরে আমরা কোনো ঈদ পালন করিনি। কোরবানির সেই আনন্দ, ত্যাগের সেই অনুভূতি আর মাংস ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। কোরবানি ছাড়া কিসের ঈদ?’
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের রূপ। সমালোচকদের মতে, এই পরিস্থিতি গাজার অর্থনৈতিক কাঠামোকেও গভীর সংকটে ফেলেছে, যেখানে ১৬ লাখ মানুষ এখন চরম খাদ্য সংকটে, সেখানে একটি তাজা মাংসের টুকরো এখন গাজাবাসীর কাছে বিলাসিতা।
গাজার আকাশে ঈদের চাঁদ উঠবে ঠিকই, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদের মানুষেরা হয়তো আরও একবার কেবল বেঁচে থাকার প্রার্থনাতেই দিনটি পার করবেন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই