ধর্ম ডেস্ক
২২ মে ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
ইসলামে কিছু সময়কে অন্য সময়ের ওপর বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; যেমন রমজানের শেষ দশক, জুমার দিন, শবে কদর। তেমনি বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ সময়গুলোর অন্যতম হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। আল্লাহ তাআলা কোরআনে এই সময়কে বিশেষভাবে শপথ করে উল্লেখ করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (স.) একে নেক আমলের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন- ‘শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।’ (সুরা ফাজর: ১-২) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), কাতাদা ও মুজাহিদ (রা.)সহ প্রখ্যাত সাহাবি ও তাফসিরবিদগণের মতে এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসির ইবনে কাসির)
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন- ‘জিলহজের প্রথম দশ দিনের বিশেষত্ব হলো এতে ইসলামের প্রধান ইবাদতগুলো (নামাজ, রোজা, হজ ও কোরবানি) একত্রিত হয়েছে।’ (ফাতহুল বারি)
আল্লাহ যখন কোনো সময়ের শপথ করেন, তা সেই সময়ের অসাধারণ মর্যাদার প্রমাণ।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন- জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্যকোনো দিনের আমলই উত্তম নয়। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী (স.) বললেন- জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা স্বতন্ত্র, যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯; সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৮)
আলেমরা বলেন, এই হাদিস নেক আমলের মর্যাদা বোঝাতে অতিশয় শক্তিশালী দলিল।
আরও পড়ুন: যে আমলকে ধনীদের হজ-ওমরা-সদকার চেয়ে উত্তম বলেছেন নবীজি
হজ: ইবাদতের মহাসম্মেলন
এই সময়ের সবচেয়ে বড় আমল হলো হজ। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘হজে মাবরুরের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)
আরাফার দিনের রোজা: দুই বছরের গুনাহ মাফ
জিলহজের ৯ তারিখ আরাফার দিন। হজযাত্রীদের জন্য এটি হজের মূল দিন, আর যারা হজে নেই তাদের জন্যও এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২) এই দিন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন বলেও হাদিসে এসেছে।
কোরবানি: সেরা আমল
জিলহজের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা ও কোরবানির দিন। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘কোরবানির দিন আদম সন্তানের কোনো আমলই আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।’ (তিরমিজি: ১৪৯৩)
জিকির ও তাকবির
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- এই দিনগুলোতে তোমরা বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করো। (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৬) সাহাবায়ে কেরাম এ সময় বাজার, মসজিদ ও ঘরে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন।
আরও পড়ুন: সৃষ্টিকূলে সর্বোচ্চ সওয়াব: ৩ জিকির প্রতিদিন ১০০ বার
চুল-নখ না কাটা: যিনি কোরবানি করার নিয়ত করেছেন, জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা মোস্তাহাব। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)
তাকবিরে তাশরিক: ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা নারী-পুরুষ সবার জন্য ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া, আরাফার দিনসহ নফল রোজা রাখা, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির বাড়ানো, দান-সদকা করা, তওবা-ইস্তেগফার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করা।
জিলহজের প্রথম ১০ দিন আত্মশুদ্ধি, তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান মৌসুম। হজ, কোরবানি, রোজা ও জিকিরের এমন অপূর্ব সমন্বয় বছরের অন্যকোনো সময়ে পাওয়া যায় না। অনেকে ঈদের আনন্দে ব্যস্ত থাকলেও প্রকৃত সফলতা হলো এই দিনগুলোকে ইবাদত ও নেক আমলে সমৃদ্ধ করে তোলা।
তথ্যসূত্র: তাফসির ইবনে কাসির, তাফসির তাবারি, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ, ফাতহুল বারি