ধর্ম ডেস্ক
১৭ মে ২০২৬, ০১:১১ পিএম
আধুনিক জীবনে খাদ্যাভ্যাস শুধুই রুচির বিষয় নয়। এটি একজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্থিতিশীলতা, ইবাদতের একাগ্রতা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান বিস্তার ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসলাম খাদ্যকে কখনো নিছক পেট ভরার উপকরণ হিসেবে দেখেনি। আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র (তৈয়্যেব) তা আহার করো।’ (সুরা বাকারা: ১৬৮)
আজ মুসলিম সমাজে হারাম খাবারের ভয় তুলনামূলকভাবে থাকলেও, হালাল কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যে ইবাদত, মনোযোগ ও কর্মশক্তিকে ধ্বংস করছে- সে বিষয়ে সচেতনতা খুব কম। এখানে দুটি মানদণ্ড উপস্থিত- হালাল (বৈধতার মানদণ্ড) এবং তৈয়্যেব (বিশুদ্ধতা, নিরাপদতা ও উপকারিতার মানদণ্ড)। আধুনিক খাদ্যসংস্কৃতির একটি বড় অংশ এই দুটি মানদণ্ডের কোনো একটি বা উভয়কেই লঙ্ঘন করছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘আদম সন্তান পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। কয়েক গ্রাস যদি মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে তাহলে তাই যথেষ্ট। যদি বেশি খেতেই হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসের জন্য রাখো।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৩৮০; ইবনে মাজাহ: ৩৩৪৯ (হাসান সহিহ)
আরও পড়ুন: সুস্বাস্থ্যের জন্য নবীজির ৬ উপদেশ
এই একটি হাদিসেই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের একটি মূলনীতি প্রতিফলিত। ফাস্ট ফুডে থাকা অতিরিক্ত চর্বি, পরিশোধিত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট নিয়মিত গ্রহণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ দেখা দেয়। শরীর যখন ভারি ও ক্লান্ত, তখন দীর্ঘ কিয়াম, রাতের তাহাজ্জুদ এবং ফজরের জন্য জাগ্রত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্যাভ্যাস সরাসরি ইবাদতের মানকে প্রভাবিত করে। এখানে উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে হারাম ঘোষণা করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সচেতনতা তৈরি করা।
আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাবারে সংরক্ষণকারী রাসায়নিক, কৃত্রিম রঙ, অতিরিক্ত সোডিয়াম এবং পরিশোধিত উপাদান ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও কিছু ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
ইসলামি পণ্ডিতগণ ‘তৈয়্যেব’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, খাবার কেবল হারাম উপাদানমুক্ত হলেই চলবে না- তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ও নিরাপদও হতে হবে। ইবনে কাসির (রহ.) ‘তৈয়্যেব’ বলতে এমন বস্তুকে বুঝিয়েছেন যা স্বভাবগতভাবে কল্যাণকর, অপবিত্রতামুক্ত ও ক্ষতিহীন। সেই মানদণ্ডে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর এমন খাবার সচেতনভাবে গ্রহণ করা প্রশ্নবিদ্ধ।
আরও পড়ুন: কাজে অনীহা? অলসতা কাটাতে নববী দাওয়াই
ইসলামি দর্শনে শরীর মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং আল্লাহ প্রদত্ত একটি আমানত, যার হিসাব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামতের দিন কোনো বান্দা পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত তার পা অগ্রসর হবে না... তার যৌবনকাল কীভাবে ও উপার্জন কোন পথে ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬)
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন- ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৫)
কার্বোনেটেড পানীয়, এনার্জি ড্রিঙ্কস ও অতিরিক্ত মিষ্টান্ন জাতীয় খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানার পরও সেগুলো অব্যাহতভাবে গ্রহণ করা এই আমানতের প্রতি অবহেলার শামিল।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। অসুস্থ মানুষ কেবল তার নিজের ইবাদত ও কর্মেই বাধাগ্রস্ত হয় না, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনেও পিছিয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ শায়খ আহমাদুল্লাহর
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম: ২২৩)
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি খাবার ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো রোগ ছড়ায়। পরিচ্ছন্নতার প্রতি ইসলামের এই জোরালো গুরুত্ব কেবল আচারিক বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের একটি সামগ্রিক দর্শন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বাজারে এক ব্যক্তিকে খাদ্যে ভেজাল মেশাতে দেখে বলেছিলেন- ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১০২)
খাদ্যে ভেজাল মেশানো একইসাথে একটি ফৌজদারি অপরাধ, একটি সামাজিক ব্যাধি এবং একটি কবিরা গুনাহ। এটি একটি সুস্থ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাজ গঠনের পথে বড় প্রতিবন্ধক।
রাসুলুল্লাহ (স.) এশার পর অনর্থক জাগরণ অপছন্দ করতেন এবং ভোরে দিন শুরু করতেন। বর্তমান সংস্কৃতিতে গভীর রাতে ভারি আহার প্রচলিত হয়ে পড়েছে। এতে হজমতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঘুমের গুণমান কমে এবং ফজরের সালাতে উঠতে কষ্ট হয়। আধুনিক ঘুম-বিজ্ঞান এবং সুন্নাহ- উভয়ই এই অভ্যাসের বিপক্ষে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ, ইবাদতের আগ্রহ, কর্মক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। ইসলাম সেই জীবনব্যবস্থার দিকে আহ্বান করে, যেখানে খাদ্য হবে হালাল, বিশুদ্ধ, পরিমিত ও উপকারী। একটি সুস্থ শরীরই পারে নামাজে মনোযোগ দিতে, কোরআন অনুধাবন করতে, পরিবারকে সময় দিতে এবং সমাজের জন্য সৎ কাজ করতে। মুসলিমের খাদ্যচিন্তা তাই শুধু ‘হারাম কি না’- এতটুকুতে সীমাবদ্ধ হতে পারে না; বরং ‘এটি কি উপকারী, পরিমিত ও তৈয়্যেব?’- সেই প্রশ্নও জরুরি। তাই খাদ্য নির্বাচনে সচেতনতা কেবল স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের পরামর্শ নয়; এটি একটি ঈমানি দায়িত্ব।