ধর্ম ডেস্ক
০৯ মে ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও তা কোনো অবাধ স্বাধীনতা নয়। বরং পরিস্থিতি, সক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের ওপর নির্ভর করে এটি কখনো ‘জরুরি’, আবার কখনো ‘নিষিদ্ধ’ হতে পারে। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ২য় বিয়ে একটি বড় আমানত, ইনসাফের দায়িত্ব এবং চারিত্রিক শুদ্ধতার পরীক্ষা।
কোরআনের মূল ভিত্তি: ন্যায়বিচার শর্ত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন- ‘তোমাদের পছন্দের নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা নিসা: ৩)
এই আয়াতে আল্লাহ ‘ইনসাফ’কে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন। শরিয়তের নির্দেশ হলো- আচরণ, ভরণপোষণ, সময় বণ্টন এবং বাহ্যিক অধিকারে কোনোভাবেই বৈষম্য করা যাবে না।
আরও পড়ুন:
২য় বিয়ে যখন গুনাহের কারণ হতে পারে
ইসলামি ফিকহ ও মূলনীতির আলোকে নিম্নলিখিত অবস্থায় ২য় বিয়ে করা গুনাহ বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হয়-
ইনসাফ করতে না পারার আশঙ্কা: যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত জানেন বা তার প্রবল ধারণা হয় যে, তিনি উভয় স্ত্রীর মাঝে সময় বণ্টন, খাবার-পোশাক ও আবাসনে সমতা বজায় রাখতে পারবেন না, তাহলে তার জন্য ২য় বিয়ে করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যার দুই স্ত্রী আছে এবং সে একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, কেয়ামতে সে এক পাশ অবশ অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (সুনান আবু দাউদ: ২১৩৩)
আর্থিক সক্ষমতার অভাব: যখন কোনো ব্যক্তি একটি পরিবারের ভরণপোষণ দিতেই হিমশিম খান, তখন ২য় বিয়ের মাধ্যমে অন্যজনের হক নষ্ট করা মাকরুহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধ। শরিয়তের মূলনীতি হলো- নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না, অন্যকেও ক্ষতি করা যাবে না।
বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য: যদি ২য় বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হয় প্রথম স্ত্রীকে তুচ্ছজ্ঞান করা বা কষ্ট দেওয়া, তাহলে সেই বিয়ে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আরও পড়ুন:
২য় বিয়ে যখন জরুরি বা প্রয়োজনীয়
বিশেষ কিছু ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ২য় বিয়ে একটি শরিয়তসম্মত সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়-
চরিত্র ও সতীত্ব রক্ষার খাতিরে: ফুকাহায়ে কেরামের একটি অংশের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন যেখানে প্রথম স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা অন্যকোনো অনিবার্য কারণে চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে এবং হারামে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, ইনসাফের পূর্ণ সক্ষমতা থাকা সাপেক্ষে ২য় বিয়ে তার জন্য ওয়াজিব বা মোস্তাহাব হয়ে দাঁড়ায়।
বংশধারা রক্ষা ও পারিবারিক সমঝোতা: যদি দম্পতি দীর্ঘ সময় ধরে সন্তানসংক্রান্ত জটিলতায় ভোগেন এবং উভয়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাহলে প্রথম স্ত্রীর অধিকার ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে ২য় বিয়ে একটি কার্যকর পারিবারিক সমাধান হতে পারে।
সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা: বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা অভিভাবকহীন অসহায় নারীদের সুরক্ষা ও সম্মান প্রদানে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ২য় বিয়ে করা সওয়াবের কাজ। ইসলামের ইতিহাসে একাধিক বিয়ের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নারীর মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন:
আধুনিক প্রেক্ষাপটে আলেমদের পর্যবেক্ষণ
সমসাময়িক আলেমদের মতে, বর্তমান যুগে শুধু আর্থিক সামর্থ্য থাকলেই হয় না; ২য় বিয়ের ক্ষেত্রে মানসিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকা অপরিহার্য। আবেগপ্রবণ হয়ে হুট করে ২য় বিয়ে করার চেয়ে বিদ্যমান পরিবারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যদি না বিশেষ শরিয়তসম্মত প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২য় বিয়ে ইসলামের একটি আইনসম্মত বিধান, তবে এটি নিছক সুবিধা নয়; বরং একটি দায়বদ্ধতা। যেখানে ন্যায়বিচার, সামর্থ্য এবং প্রকৃত প্রয়োজন আছে, সেখানে এটি বৈধ ও ইনসাফপূর্ণ। আর যেখানে জুলুম, অবহেলা বা কেবল প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ আছে, সেখানে এটি গুনাহের কারণ। তাই আবেগ নয়, কোরআন-সুন্নাহ ও তাকওয়ার আলোকে দায়িত্ববোধের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াই একজন মুমিনের পরিচয়।
তথ্যসূত্র: সুরা নিসা (৩, ১২৯); সুনান আবু দাউদ: ২১৩৩; সহিহ বুখারি: ৫০৬৬; ফতোয়ায়ে শামি (বাবুন নিকাহ); আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু