ধর্ম ডেস্ক
০১ মে ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক জীবনব্যবস্থা। ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন তা দায়িত্বশীলতা ও নিয়মশৃঙ্খলার উপর জোর দেয়, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের কষ্ট, নিরাপত্তা ও বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে ‘রুখসত’ বা ছাড় দেয়। প্রবল বৃষ্টি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা চলাচলে মারাত্মক অসুবিধা সৃষ্টি হলে জুমার জামাতে উপস্থিত না থাকার অনুমতি- এমনই একটি শরয়ি রুখসত।
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, মুকিম (নিবাসী) ও সামর্থ্যবান মুসলিম পুরুষের জন্য জুমার নামাজ ফরজে আইন। তবে শরিয়তে কিছু গ্রহণযোগ্য ‘ওজর’ রয়েছে, যেগুলোর উপস্থিতিতে জুমা ত্যাগ করে জোহর আদায় করা বৈধ হয়। এর মধ্যে রয়েছে- অসুস্থতা, প্রবল বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা এবং এমন কষ্টকর পরিস্থিতি, যা স্বাভাবিকভাবে সহ্য করা কঠিন।
অতএব, যদি বৃষ্টির কারণে মসজিদে যাওয়া কষ্টসাধ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তবে এটি শরিয়তসম্মত ওজর হিসেবে গণ্য হবে।
আরও পড়ুন: জুমার নামাজে রাকাত ছুটে গেলে করণীয়
এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এক বৃষ্টির দিনে মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ দেন যেন আজানে হাইয়া আলাস সালাহ এর পরিবর্তে বলা হয়- সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম (তোমরা নিজেদের ঘরে নামাজ আদায় করো)। লোকেরা এতে বিস্মিত হলে তিনি বলেন- ‘এ কাজ তিনি (রাসুলুল্লাহ স.) করেছেন, যিনি আমার চেয়ে উত্তম। জুমা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমি অপছন্দ করেছি যে তোমরা কাদা ও পিচ্ছিল পথে কষ্ট করে মসজিদে আসো। (সহিহ বুখারি: ৯০১)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বৃষ্টি ও প্রচণ্ড শীতের রাতে মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ দিতেন ঘোষণা করতে- আলা সাল্লু ফি রিহালিকুম (শোনো, তোমরা নিজ নিজ অবস্থানে নামাজ আদায় করো)। (সহিহ বুখারি: ৬৬৬)
এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কষ্টসাধ্য আবহাওয়ায় জামাতে অনুপস্থিত থাকার অনুমতি রয়েছে।
আরও পড়ুন: জুমার শেষ রাকাতের রুকু না পেলে জোহর পড়তে হবে?
ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইমামগণও এই বিষয়ে একমত যে, প্রবল বৃষ্টি জুমা ত্যাগের বৈধ কারণ হতে পারে-
হানাফি মাজহাব: যদি বৃষ্টির তীব্রতা এমন হয় যে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে, অথবা কাদা-পানির কারণে শরীর ও কাপড় মারাত্মকভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে জুমার পরিবর্তে ঘরে জোহর পড়া জায়েজ। (ফতোয়ায়ে শামি: ২/১৪৯)
শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব: প্রবল বৃষ্টি বা অনুরূপ দুর্যোগে জুমা ও জামাত ত্যাগ করা বৈধ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। (আল-মাজমু: ৪/৪৮৩)
এ থেকে বোঝা যায়, এটি কোনো একক মত নয়; বরং উম্মাহর স্বীকৃত ফিকহি অবস্থান।
১. জুমার জামাত ছুটে গেলে জুমার পরিবর্তে ৪ রাকাত জোহর নামাজ আদায় করতে হবে।
২. জোহরের ওয়াক্ত হওয়ার পর এ নামাজ একাকী পড়াই নিয়ম; বাড়িতে জোহর বা জুমার আলাদা জামাত করা অনুত্তম বা সঠিক পদ্ধতি নয়।
৩. যারা শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে মসজিদে যেতে পারেননি, তারা ঘরে জোহরের মাধ্যমেই জুমার পূর্ণ সওয়াব লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি অবজ্ঞাভরে পরপর তিনটি জুমা ত্যাগ করে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১০৫২, তিরমিজি: ৫০০)
বর্তমান সময়ে অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি (যেমন: ব্যক্তিগত যানবাহন, রিকশা বা মসজিদের নিকটবর্তী অবস্থান) বৃষ্টির মধ্যেও মসজিদে যাতায়াতকে তুলনামূলক সহজ করেছে। তাই যদি বাস্তবে মসজিদে যেতে বড় কোনো কষ্ট, ঝুঁকি বা দুর্ভোগের আশঙ্কা না থাকে, তবে জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে উপস্থিত হওয়াই উত্তম এবং তাকওয়ার দাবি। তবে যেখানে প্রবল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা বা নিরাপত্তাজনিত কারণে কষ্ট ও ঝুঁকি বিদ্যমান, সেখানে শরিয়তের প্রদত্ত রুখসত গ্রহণ করে ঘরে জোহর আদায় করা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।