images

ইসলাম

মোবাইল অ্যাপে কোরবানি বুকিং: শরয়ি বিধান ও করণীয়

ধর্ম ডেস্ক

৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১১ পিএম

ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন দ্রুত বদলেছে, তেমনি ইবাদতের কিছু ব্যবস্থাপনাতেও এসেছে নতুন ধারা। কোরবানির পশু কেনাবেচা এবং বুকিং এখন অনেক ক্ষেত্রেই মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সময়ের অভাব, যানজট এবং হাটের ভিড় এড়ানোর প্রবণতা এই পদ্ধতিকে ক্রমেই জনপ্রিয় করে তুলছে। কোরবানি যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তাই কেবল সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না; বরং এর শরয়ি বৈধতা এবং বাস্তব নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।

ওয়াকালাহ বা প্রতিনিধিত্বের বিধান

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কোরবানি ঈদুল আজহার নির্ধারিত দিনগুলোতে সম্পন্ন করতে হয়। এর মূল শর্তগুলো হলো- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পশু জবাই করা, আল্লাহর নামে জবাই করা, ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচন করা এবং একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখা।
ইসলামি বিধানে কোরবানি নিজ হাতেই করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য কাউকে নিজের পক্ষে দায়িত্ব দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ, যাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘ওয়াকালাহ’ বলা হয়। ইমাম নববি (রহ.) তাঁর আল-মাজমু' গ্রন্থে এবং ইবনে কুদামা (রহ.) আল-মুগনিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে কোরবানিতে প্রতিনিধি নিয়োগ করা জায়েজ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি বুকিং মূলত এই ওয়াকালাহ প্রথারই একটি আধুনিক ডিজিটাল রূপ।

অনুপস্থিত পশু ক্রয়ের শরয়ি ভিত্তি

ইসলামি ফিকহে অনুপস্থিত কোনো বস্তু তার সঠিক বিবরণ উল্লেখ করে ক্রয়-বিক্রয় করাকে বৈধ বলা হয়েছে। এই পদ্ধতিকে ফিকহে ‘বায় বিল ওয়াসফ’ বা ‘বায়উল গায়িব’ নামে আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ কোনো পশুর বয়স, আনুমানিক ওজন, জাত এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঠিক বিবরণ দিয়ে ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে তা ক্রয় করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত প্রযোজ্য, যা হানাফি মাজহাবে ‘খিয়ারুর রুইয়াহ’ নামে পরিচিত। এই নীতি অনুযায়ী পশুটি সরেজমিন দেখার পর যদি বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবের উল্লেখযোগ্য অমিল ধরা পড়ে, তাহলে ক্রেতা চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখেন। তাই ক্রেতার জন্য প্রতিষ্ঠানের রিফান্ড ও বিনিময় নীতি সম্পর্কে আগে থেকেই স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু কেনার আগে যাচাই করুন এই ৭টি বিষয়

ভাগে কোরবানির বিধান

ভাগে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে মোবাইল অ্যাপ একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেক প্ল্যাটফর্ম অপরিচিত ব্যক্তিদের একত্র করে একটি পশুতে অংশীদার করে দেয়। ফিকহের দৃষ্টিতে একটি পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন এবং প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি বা অন্য কোনো ইবাদত (যেমন আকিকা); শুধু গোশত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নয়।
এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। জমহুর তথা অধিকাংশ আলেমের মত হলো, একজন অংশীদারের ব্যক্তিগত পাপ অন্যদের কোরবানিকে বাতিল করে না, যদি অন্যরা নিজেদের শর্ত পূরণ করে থাকেন। তবে সকলের নিয়ত যেন ইবাদতমুখী হয়- এটি নিশ্চিত করা উত্তম ও অধিক নিরাপদ। আলেমগণ সতর্কতার স্বার্থে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করাকেই সর্বোত্তম বলেছেন। কিছু বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থে অন্যের গলদ নিয়ত বা উপার্জনের কারণে অন্য শরিকদের কোরবানি নষ্ট হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

কোরবানির সময়সীমা নিশ্চিত করা

অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানির ব্যবস্থাপনা করা হলে একটি বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে- পশু জবাই অবশ্যই ঈদের নামাজের পরে সম্পন্ন হতে হবে। ঈদের নামাজের আগে জবাই করা হলে তা কোরবানি হিসেবে শুদ্ধ হবে না- এ বিষয়ে সকল মাজহাবে ঐকমত্য রয়েছে। সময়সীমার প্রশ্নে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কোরবানির সময় মোট তিন দিন, আর শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী ১৩ই জিলহজ পর্যন্ত চার দিন। তাই সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা নেওয়া আবশ্যক।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর দ্বিমত, কী করবেন?

জীবন্ত ওজনভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ

আধুনিক অনেক অ্যাপে পশুর জীবন্ত ওজন (লাইভ ওয়েট) অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়। যদিও ক্লাসিক ফিকহে এ পদ্ধতি নিয়ে কিছু আলোচনা ছিল, তবে বর্তমান উরফ (প্রচলিত রীতি) ও লেনদেনের স্বচ্ছতার বিবেচনায় সমকালীন অধিকাংশ আলেম ও ফতোয়া বোর্ড এটিকে বৈধ বলেছেন। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং ধোঁকাবাজির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

সতর্কতা ও করণীয়

বাস্তব প্রেক্ষাপটে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, কেবল নিবন্ধিত, সুপরিচিত এবং সুনামসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন। দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে পশু চূড়ান্ত করার আগে ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি দেখে নিন। তৃতীয়ত, অগ্রিম অর্থ প্রদানের আগে প্রতিষ্ঠানের রিফান্ড নীতি যাচাই করুন। চতুর্থত, কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর ছবি বা ভিডিও প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখুন।

মোটকথা, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানি বুকিং শরিয়াহ অনুযায়ী মূলত বৈধ, তবে এর সকল শর্ত যথাযথভাবে পূরণ হওয়া অপরিহার্য। কোরবানির মূল প্রেরণা হলো তাকওয়া ও আন্তরিকতা- যা আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭) প্রযুক্তি বা প্রচলিত পদ্ধতি মাধ্যম যাই হোক, মূল লক্ষ্য সর্বদা একটিই: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

দ্রষ্টব্য: ইবাদত সন্দেহমুক্ত করতে বিশেষ মাসয়ালার ক্ষেত্রে নিজ এলাকার বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।