images

ইসলাম

বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারীর হজ: মাহরাম কে হবেন?

ধর্ম ডেস্ক

২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হলো হজ। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এই ফরজ আদায়ের জন্য ‘মাহরাম’ থাকা শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিশেষ করে বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ফিকহি আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমান সময়ে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হলেও শরিয়তের মূল বিধান পরিবর্তিত হয়নি। তাই দলিলের আলোকে বিষয়টি বোঝা জরুরি।

মাহরাম কারা?

শরিয়তের পরিভাষায় মাহরাম হলেন সেই পুরুষ, যার সঙ্গে কোনো নারীর বিবাহ চিরতরে হারাম। যেমন- পিতা, দাদা, নানা, ছেলে, নাতি, ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নে, চাচা, মামা, দুধসম্পর্কীয় পিতা ও ভাই, শ্বশুর ও জামাতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, স্বামী শরিয়ত নির্ধারিত মাহরাম না হলেও (কেননা তাঁর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ), হজের সফরের ক্ষেত্রে তিনি মাহরামের স্থলাভিষিক্ত এবং প্রধান সফরসঙ্গী।

হাদিসের আলোকে মাহরামের বাধ্যবাধকতা

নারীর দীর্ঘ সফরে মাহরাম থাকা আবশ্যক- এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য তার পিতা, ছেলে, স্বামী, ভাই বা অন্যকোনো মাহরাম ছাড়া তিনদিন বা তার অতিরিক্ত সময়ের পথ সফর করা বৈধ নয়।’ (সহিহ মুসলিম: ৩১৬১)
অন্য হাদিসে এসেছে- এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার প্রক্কালে তার স্ত্রীর হজের কথা বললে নবী (স.) তাকে জিহাদ বাদ দিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে হজে যেতে নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ৩০০৬)

আরও পড়ুন: হজে নারীদের সতর্কতা: কী করবেন, কী করবেন না 

যারা মাহরাম হতে পারেন (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে)

১. সন্তান বা বংশধর: প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান আপন ছেলে, নাতি বা পুতি (সাধারণত মায়ের জন্য সন্তানই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম সফরসঙ্গী)।
২. পিতা বা ঊর্ধ্বতন পুরুষ: আপন পিতা, দাদা কিংবা নানা।
৩. ভাই: আপন সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই কিংবা বৈপিত্রীয় ভাই।
৪. ভাতিজা বা ভাগ্নে: আপন ভাই বা বোনের ছেলে।
৫. চাচা বা মামা: বাবার আপন ভাই (চাচা) কিংবা মায়ের আপন ভাই (মামা)।
৬. দুগ্ধ সম্পর্কের ভাই বা পিতা: ছোটবেলায় নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কারো দুধ পান করে থাকলে সেই দুধ-ভাই বা দুধ-পিতা।
৭. জামাতা: আপন মেয়ের স্বামী। (শরিয়ত অনুযায়ী জামাতাও স্থায়ী মাহরাম)।

সবচেয়ে ভালো মাহরাম কে?

যদিও উপরের সবাই মাহরাম, তবে হজের দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য সফরের খাতিরে নিজের সন্তান (ছেলে) অথবা আপন ভাইকে মাহরাম হিসেবে পাওয়া সবচেয়ে বেশি স্বস্তিদায়ক ও উত্তম। কারণ তাঁদের সাথে পর্দার কঠোরতা যেমন নেই, তেমনি শারীরিক ও মানসিক সেবার ক্ষেত্রে তাঁরা সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হন।

জরুরি শর্ত: মাহরামের গুণাবলি: সফরসঙ্গী মাহরামকে অবশ্যই মুসলমান, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ) এবং সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অবুঝ কাউকে মাহরাম হিসেবে নিয়ে হজে যাওয়া বৈধ নয়।

বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা নারীর বিশেষ বিধান

১. ইদ্দত পালন: বিধবা ৪ মাস ১০ দিন। তালাকপ্রাপ্তা ৩ ঋতুস্রাবকাল। ইদ্দত চলাকালে হজে যাওয়া বৈধ নয়।

২. বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে হজ: বোনের স্বামী (ভগ্নিপতি) মাহরাম নন। তাই বোন ও তার স্বামীর সঙ্গে হজে যাওয়া শরিয়তসম্মত নয়।

৩. প্রতিবেশী বা পরপুরুষের সঙ্গে হজ: বিশ্বস্ত প্রতিবেশী বা তার স্ত্রী থাকলেও মাহরাম ছাড়া হজে যাওয়া বৈধ নয়।

আরও পড়ুন: নারীরা কি স্বামীর টাকায় ফরজ হজ করতে পারবেন? 

মাহরাম না থাকলে করণীয়

যদি কোনো নারীর ওপর হজ ফরজ হয় কিন্তু মাহরাম না থাকে, তাহলে-

  • মাহরাম পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন
  • প্রয়োজনে নিজের খরচে মাহরামকে সঙ্গে নেবেন
  • বার্ধক্য বা অক্ষমতা হলে ‘হজে বদল’ করাবেন
  • অথবা অসিয়ত করে যাবেন। (ফাতহুল কাদির: ২/৩২৭)

মাহরাম ছাড়া হজের হুকুম ও বাস্তবতা

ফিকহি দৃষ্টিতে হজ আদায় হয়ে যাবে, তবে মাহরাম ছাড়া সফরের কারণে গুনাহ হবে (বাদায়েউস সানায়ে: ২/৩০০)
বর্তমানে গ্রুপ হজের প্রশাসনিক সুযোগ থাকলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে মাহরামের বিধান অক্ষুণ্ণ। অনেক ক্ষেত্রে “ভুয়া মাহরাম” ব্যবহার করা হয়, যা স্পষ্ট মিথ্যা ও গুনাহের কাজ। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৫৮)

শরিয়তের উদ্দেশ্য নারীর নিরাপত্তা, শালীনতা এবং ইবাদতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা। তাই সর্বোত্তম হলো মাহরামসহ হজ আদায় করা। ভিন্ন ফিকহি মত গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য ও বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী শরিয়তসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। সামর্থ্যবান নারীদের উচিত হজকে বিলম্ব না করে যথাসম্ভব শরিয়তসম্মত উপায়ে আদায়ের চেষ্টা করা।

তথ্যসূত্র: বুখারি; মুসলিম; দারাকুতনি; ফাতহুল কাদির: ২/৩২৭; হিন্দিয়া: ১/২১৯; বাদায়ে: ২/৩০০; রদ্দুল মুহতার: ২/৪৫৮; মানাসিক