images

ইসলাম

কোরবানির টাকা দান করলে কি কোরবানি আদায় হবে?

ধর্ম ডেস্ক

২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

ঈদুল আজহার প্রাক্কালে প্রতি বছর একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে- কোরবানির পশুর পেছনে অর্থ ব্যয় না করে সেই টাকা গরিব বা অভাবী আত্মীয়কে দান করলে কি কোরবানির দায়িত্ব আদায় হবে? অনেকে মনে করেন, পশু কেনার চেয়ে সরাসরি অর্থ দান করা বেশি উপকারী। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণা সঠিক নয়। এ বিষয়ে ফিকহবিদদের অবস্থান সুস্পষ্ট ও সর্বসম্মত।

পশু জবাইই মূল ইবাদত

কোরবানি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যার নির্দিষ্ট পদ্ধতি শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা কাউসারের ২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ এই আয়াতে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; অর্থ দানের নয়। সুরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘প্রতিটি উম্মতের জন্য আমি কোরবানির বিধান রেখেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ পশুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ এই আয়াতেও কোরবানির মূল বিষয় হিসেবে পশু জবাইকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

আত্মীয়কে দান করলেও কোরবানি মাফ হবে না

অনেকে মনে করেন, নিজের ভাই বা নিকটাত্মীয়কে কোরবানির টাকা দিয়ে দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ফিকহের প্রামাণিক গ্রন্থ ফতোয়া আলমগিরিতে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোরবানি না করে এর টাকা দান করে দিলে কোরবানির বিধান রহিত হবে না। বরং তাকে কোরবানি করতেই হবে। (আলমগিরি: ৫/২৯৩) অর্থাৎ দান করা আলাদা সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু এতে কোরবানির ‘ওয়াজিব’ আদায় হয় না।

আরও পড়ুন: শরিকদের কেউ কম টাকা দিলে কোরবানি শুদ্ধ হবে?

ফিকহের দালিলিক অবস্থান

হানাফি ফিকহের সকল প্রামাণিক গ্রন্থে এই বিষয়ে একই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ইবনু আবিদিন (রহ.) ফতোয়ায়ে শামিতে বলেন, কোরবানির দিনগুলোতে পশু জবাই করাই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য; কোরবানির পরিবর্তে সদকা করলে ওয়াজিব আদায় হবে না। (শামি: ৬/৩২০) ইমাম কাসানি (রহ.) বাদায়েউস সানায়েতে বলেন, কোরবানির উদ্দেশ্য হলো পশু জবাই করে রক্ত প্রবাহিত করা। তাই মূল্য দান করলে ওয়াজিব আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৪)

কেবল হানাফি মাজহাব নয়, শাফেয়ি মাজহাবে ইমাম নববি (রহ.) আল মাজমুতে এবং হাম্বলি মাজহাবে ইবনু কুদামা (রহ.) আল মুগনিতে একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, কোরবানির ইবাদত পশু জবাইয়ের মধ্যেই নিহিত, স্রেফ অর্থদানে নয়।

প্রচলিত যুক্তির জবাব

অনেকে বলেন, গরিবদের সরাসরি টাকা দিলে বেশি উপকার হয়। এই যুক্তি মানবিকভাবে সংগত মনে হলেও শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতির বিপরীতে গ্রহণযোগ্য নয়। ফকিহগণ এ ক্ষেত্রে একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন- ‘যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)

আরও পড়ুন: ঋণ থাকলে কোরবানি করার বিধান কী

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) মাজমুউল ফতোয়াতে বলেন, ইবাদতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যুক্তি দিয়ে শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কোরবানির বিধানের গূঢ় রহস্য মানুষের পূর্ণ বোধগম্য না হলেও আনুগত্যের দাবি হলো তা পালন করা।

কোরবানির সময় পেরিয়ে গেলে করণীয়

কোরবানির টাকা দানের বিধান কেবল তখনই আসে, যখন জবাইয়ের নির্ধারিত সময় ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পেরিয়ে যায়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই সময়ে পশু জবাই না করলে পশুর সমমূল্য সদকা করা ওয়াজিব। তবে এটি কোরবানির বিকল্প নয়; বরং ওয়াজিব ছুটে যাওয়ার কারণে আরোপিত ‘কাফফারা’ বা ক্ষতিপূরণ।

সারসংক্ষেপ

কোরবানি এবং দান- উভয়ই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, কিন্তু একটি দিয়ে অপরটির দায়িত্ব আদায় হয় না। সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে পশু জবাইয়ের মাধ্যমেই এই মহান ইবাদত সম্পন্ন করতে হবে। অভাবী আত্মীয় বা প্রতিবেশীকে সাহায্য করতে চাইলে তা কোরবানির অতিরিক্ত হিসেবে দান করা উচিত; কোরবানির বিকল্প হিসেবে নয়।

তথ্যসূত্র: সুরা কাউসার: ২; সুরা হজ: ৩৪; ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯৩; ফতোয়ায়ে শামি: ৬/৩২০; বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৪; ইবনে মাজাহ: ৩১২৩; আল-মাজমু; আল-মুগনি

দ্রষ্টব্য: ব্যক্তিগত বিশেষ মাসয়ালায় নিজ এলাকার বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।