ধর্ম ডেস্ক
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ অন্যতম একটি রুকন। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। তবে আমাদের সমাজে হজ ও ওমরা নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ওমরা করলে বোধহয় হজের ফরজ দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। শরিয়তের সূক্ষ্ম বিচারে এই ধারণাটি সঠিক নয়। ওমরা এবং হজ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ইবাদত।
কোরআন মজিদ এবং হাদিস শরিফে হজ ও ওমরাকে পৃথকভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘মানুষের মধ্যে যে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ পালন করা তার জন্য ফরজ।’
এখানে হজকে একটি স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার সুরা বাকারার ১৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরা পূর্ণ করো।’ এই আয়াতে হজ ও ওমরাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে একটি দিয়ে অন্যটির আবশ্যকতা শেষ হয় না।
সহিহ হাদিস অনুযায়ী, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর এবং সেগুলোর মধ্যে হজও রয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৮) এখানে হজের কথা বলা হয়েছে, যা ওমরা থেকে ভিন্ন।
অনেকে একটি হাদিসের কারণে বিভ্রান্ত হন যেখানে বলা হয়েছে, রমজানে ওমরা করলে হজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, রমজান মাসে ওমরা করা হজ আদায়ের সমতুল্য। (সহিহ বুখারি: ১৭৮২) মুহাদ্দিসগণের মতে, এখানে ‘সমতুল্য’ বলতে সওয়াব বা মর্যাদার কথা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সওয়াব বেশি পাওয়া গেলেও এর মাধ্যমে ‘ফরজ হজ’ জিম্মা থেকে মাফ হবে না। সামর্থ্য থাকলে ব্যক্তিকে মূল হজ অবশ্যই আদায় করতে হবে।
চার মাজহাবের ইমাম ও ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, ওমরা হজের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না-
হানাফি মাজহাব: ইমাম মারগিনানি (রহ.) রচিত ‘আল-হিদায়া’-তে বলা হয়েছে, হজ জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট আমলের মাধ্যমেই আদায় করতে হবে। হানাফিমতে ওমরা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, যা ফরজের সমতুল্য নয়।
শাফেয়ি মাজহাব: ইমাম নববি (রহ.) ‘আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব’-এ বলেন, শাফেয়িমতে ওমরা ফরজ হলেও হজ ও ওমরার নিয়ত ও আরকান সম্পূর্ণ আলাদা।
হাম্বলি মাজহাব: ইবনু কুদামা (রহ.) ‘আল-মুগনি’-তে উল্লেখ করেন, হজের প্রধান রুকন ‘উকুফে আরাফা’ ওমরাতে নেই। তাই একটির মাধ্যমে অন্যটি আদায় হওয়া সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: হজ ও ওমরা পালনকারীরা যেসব প্রতিদান পাবেন
হজের মূল আমলগুলোর অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে ওমরা হজের বিকল্প নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফাহ।’ (নাসায়ি: ৩০১৯) ৯ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান রুকন, যা ওমরাতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এছাড়া মুজদালিফায় রাতযাপন, মিনায় অবস্থান, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ এবং হজের নির্দিষ্ট কোরবানির মতো মৌলিক আমলগুলোও ওমরাতে নেই।
সারসংক্ষেপ, ওমরা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। তবে এটি হজের বিকল্প নয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমকে জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে মক্কায় উপস্থিত হয়ে হজের আরকান পালনের মাধ্যমেই ফরজ আদায় করতে হবে। ওমরা করার মাধ্যমে বিপুল সওয়াব অর্জিত হলেও হজের ফরজ দায় ব্যক্তির ওপর থেকে যায়।
দ্রষ্টব্য: ব্যক্তিগত মাসয়ালা বা এ সংক্রান্ত কোনো জটিলতায় নিজ এলাকার বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।