ধর্ম ডেস্ক
২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মহান ইবাদত। অনেক সময় হাটে গিয়ে সুন্দর বা অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান গরু দেখে আমরা আকৃষ্ট হই, কিন্তু মনে রাখতে হবে- ‘মোটা মানেই সুস্থ নয়’। অসাধু উপায়ে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু কেনা ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত উভয় দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পশু কেনার সময় নিচের ৭টি বিষয় বিস্তারিতভাবে যাচাই করা জরুরি-
শরিয়ত অনুযায়ী, গরু বা মহিষের বয়স কমপক্ষে ২ বছর এবং ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার ১ বছর হতে হবে।
যাচাইয়ের উপায়: গরুর নিচের পাটির সামনে অন্তত দুটি কোদালের মতো স্থায়ী দাঁত থাকতে হবে। উটের ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে অন্তত ৫ বছর। তবে দুম্বা বা ভেড়ার বয়স ১ বছরের কিছু কম হলেও যদি দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়, তবে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ। কিন্তু ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।

অন্ধ, লেজ বা কান কাটা এবং শিং গোড়া থেকে উপড়ে যাওয়া পশু দিয়ে কোরবানি হয় না। এছাড়া আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন-
হাঁটিয়ে দেখা: পশুটি খুঁড়িয়ে হাঁটছে কি না তা নিশ্চিত হতে হাটের ভিড়ে পশুটিকে কিছুটা সময় হাঁটিয়ে দেখুন।
গর্ভবতী কি না: কোনো অবস্থাতেই গর্ভবতী গাভি কোরবানি দেওয়া যাবে না। সাধারণত গর্ভবতী গাভির পেট ও ওলান স্বাভাবিকের চেয়ে স্ফীত থাকে। কেনার আগে এটি অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন।

আরও পড়ুন: গর্ভবতী পশুর কোরবানির বিধান কী
অসাধু ব্যবসায়ীরা স্টেরয়েড বা ইনজেকশন দিয়ে পশুকে দ্রুত ফোলায়, যা পশুর কিডনি ও হার্টের জন্য ক্ষতিকর।
আঙুলের চাপ পরীক্ষা: গরুর পেছনের রানের মাংস বা পিঠের ওপর আঙুল দিয়ে চাপ দিন। সুস্থ গরুর মাংস শক্ত থাকে এবং চাপ দিলে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে ফোলানো পশুর মাংস অত্যন্ত নরম হয় এবং আঙুলের ছাপ দীর্ঘক্ষণ গর্ত হয়ে থাকে।
শ্বাস-প্রশ্বাস: ওষুধ খাওয়ানো গরু দ্রুত শ্বাস নেয় এবং অল্পতেই হাঁপাতে থাকে। একে প্রচণ্ড ক্লান্ত দেখাবে।
পশুর সুস্থতা চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার নাকের ওপরের অংশ বা ‘মাজল’।
ভেজা নাক: সুস্থ পশুর নাক সবসময় ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকে এবং রোদে তা চকচক করে। যদি নাক শুকনো থাকে, তবে বুঝতে হবে পশুটি অসুস্থ বা জ্বরে আক্রান্ত।
জাবর কাটা: সুস্থ পশু সবসময় মুখ নাড়াচাড়া করবে বা জাবর কাটবে। জাবর না কাটা বা মুখ দিয়ে অনবরত অতিরিক্ত ফেনা ও লালা ঝরা অসুস্থতার লক্ষণ।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশুর যেসব ত্রুটি গ্রহণযোগ্য নয়
সুস্থ পশু সবসময় সচেতন থাকে এবং অনবরত লেজ নাড়িয়ে মশামাছি তাড়ায়।
চোখ ও কান: সুস্থ পশুর চোখ থাকবে উজ্জ্বল ও সচ্ছল। কেউ কাছে গেলে বা স্পর্শ করলে সে কান নাড়াবে বা সরিয়ে নেবে। কিন্তু অসুস্থ বা ইনজেকশন দেওয়া পশু ঝিম মেরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং নড়াচড়া কম করে।

পশু কেনার সময় সময়ের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
দিনের আলো: সবসময় দিনের আলো থাকতে পশু কেনা উচিত। রাতে কৃত্রিম আলোতে পশুর গায়ের প্রকৃত রঙ, চামড়ার রোগ বা চোখের সমস্যা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
পশম ও ক্ষত: পশুর গায়ের পশম মসৃণ ও উজ্জ্বল কি না দেখুন। পশম উল্টে চামড়ায় কোনো ক্ষত, ঘা বা ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ এর গুটি আছে কি না তা ভালো করে পরীক্ষা করুন।
আরও পড়ুন: পশুর যেসব ত্রুটি থাকলেও কোরবানি সহিহ হবে
পশুটি চুরি করা কি না বা কোনো অসাধু উপায়ে আনা কি না তা নিশ্চিত হতে বিশ্বস্ত বিক্রেতা নির্বাচন করুন। পশু ক্রয়ের পর অবশ্যই হাটের নির্ধারিত ‘হাসিল’ প্রদান করে বৈধ রসিদ সংগ্রহ করুন। হাসিল ফাঁকি দেওয়া ইবাদতের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
হাট থেকে পশু আনার পর সে বেশ ক্লান্ত থাকে। তাই তাকে খাবার খাওয়ানোর জন্য জোর না করে অন্তত ৮-১০ ঘণ্টা বিশ্রাম দিন। পিপাসা মেটাতে স্যালাইন পানি বা সাধারণ পানি পান করান। পেটফাঁপা বা বদহজম এড়াতে পশুকে সামান্য খাবার সোডা মিশ্রিত পানি খাওয়ানো যেতে পারে।
মনে রাখবেন, বড় বা দামি গরু কোরবানি দেওয়া কোনো সামাজিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। পশুর বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আপনার নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং সুস্থ পশু উৎসর্গ করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। সচেতনভাবে পশু নির্বাচন করুন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন।
তথ্যসূত্র: কোরআন ও সুন্নাহর বিধান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ