ধর্ম ডেস্ক
২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
পবিত্র হজের স্মৃতিবিজড়িত মিনার পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত একটি অত্যন্ত বরকতময় ইবাদতগাহ ‘মসজিদ আল-খাইফ’ বা মসজিদুল খাইফ। এটি হজের ইতিহাসের এক অনন্য আধ্যাত্মিক সংযোগস্থল। হজরত মুসা (আ.) এবং শেষ নবী মুহাম্মদ (স.)-সহ অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিতে ধন্য এই পবিত্র ভূমি। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এই স্থানে তাঁর পূর্ববর্তী সত্তরজন নবী সালাত আদায় করেছেন।
আরবি ‘খাইফ’ শব্দের অর্থ হলো পাহাড়ের পাদদেশ বা পানির প্রবাহ থেকে উঁচুতে অবস্থিত ঢালু ভূমি। মিনার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ছোট জামরা বা শয়তানের প্রতীকী ক্ষুদ্র স্তম্ভের খুব কাছেই এই প্রাচীন মসজিদটির অবস্থান। বর্তমানে মসজিদের সামনে স্থাপিত পরিচিতি ফলকটি সাতটি ভাষায় লেখা রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাতেও ‘আল খায়েফ মসজিদ’ নামটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সুউচ্চ মিনারবিশিষ্ট এই মসজিদটি পাহাড়ের চূড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদ আল-খাইফ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে অসংখ্য নবীর ইবাদত করা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী- ‘মসজিদ আল-খাইফে সত্তরজন নবী নামাজ আদায় করেছেন।’ (আল মুজামুল কাবির; সহিহুত তারগিব: ১১২৭)
আরও পড়ুন: কাবা শরিফ সম্পর্কে অবাক করা কিছু ঐতিহাসিক তথ্য
অন্যান্য ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, হজরত মুসা (আ.)-সহ অনেক নবী হজের ইহরাম অবস্থায় এই স্থানে নামাজ আদায় করেছেন। নবীজি (স.) নিজেও মিনায় অবস্থানকালে এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। (তবারানি আওসাত: ৫৪০৭) হাজিরা যখন এখানে সালাত আদায় করেন, তখন তাঁদের হৃদয়ে এই উপলব্ধি জাগ্রত হয় যে তাঁরা এমন এক ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে আল্লাহর মনোনীত নবীগণ সেজদা করেছেন।

মসজিদ আল-খাইফ এর ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর অবস্থানের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট। পঞ্চম হিজরিতে মদিনায় হামলার লক্ষ্যে কিছু আরব গোত্র যেখানে সমবেত হয়েছিল, পরবর্তীতে সেখানেই এই বরকতময় মসজিদটি নির্মিত হয়। একসময়ের সংঘাতময় প্রেক্ষাপটের এই স্থানটি আজ ইসলামের বিজয়গাথা ও বিশ্ব মুসলিমের ইবাদতের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
মসজিদ আল-খাইফ এর বর্তমান রূপটি দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনের ফসল-
প্রাচীন আয়তন: ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মধ্যযুগে এই মসজিদের আয়তন ছিল ১২০ মিটার দীর্ঘ এবং ৫৫ মিটার প্রস্থ। কিছু বর্ণনায় একে তৎকালীন আরবের বৃহৎ মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওসমানীয় ও মামলুক আমল: ৮৭৪ হিজরিতে মিসরের মামলুকি সুলতান কাইতবা এই মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ওসমানীয় শাসনামলে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামাজের নির্দিষ্ট স্থানে একটি বড় গম্বুজ ও মেহরাব বিদ্যমান ছিল।
আরও পড়ুন: দামেস্কের যে মসজিদে ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন
সুরক্ষা ব্যবস্থা: ২৪০ হিজরিতে প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর মসজিদটি পুনর্নির্মাণের সময় এর চারপাশে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

বর্তমানে সৌদি সরকার মসজিদটিকে আধুনিক স্থাপত্যে পুনর্নির্মাণ করেছে। ১৪০৭ হিজরিতে এক বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে মসজিদের আয়তন আগের চেয়ে চারগুণ বাড়িয়ে প্রায় ২৫ হাজার বর্গমিটার করা হয়েছে।
ধারণক্ষমতা: বর্তমানে এখানে প্রায় ৩০ হাজার মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।
নান্দনিকতা: মসজিদের চার কোণায় অবস্থিত চারটি মিনার মসজিদটিকে দান করেছে এক বিশেষ গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য।

১০ম হিজরিতে বিদায় হজের সময় রাসুলুল্লাহ (স.) মসজিদ আল-খাইফের সন্নিকটে অবস্থান করেছিলেন। তিনি এখানে সাহাবিদের নিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করেন এবং হজের বিধান ও উম্মতের ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।
মিনার পবিত্র ভূমিতে এই মসজিদে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা একজন মুমিনের হৃদয়ে গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণা জোগায়। সত্তরজন নবীর ইবাদতের স্মৃতি বহনকারী এই মসজিদ হজের মর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে এবং ঈমানি চেতনাকে আরও শক্তিশালী করে।
সূত্র: আল মুজামুল কাবির: সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; আখবারু মক্কা; ঐতিহাসিক মক্কা ও মদিনার স্থাপত্য বিষয়ক দলিলাদি