ধর্ম ডেস্ক
১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
হিজরি বর্ষপঞ্জির একাদশ মাস জিলকদ। এটি ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘আশহুরে হুরুম’ বা চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। জিলকদ মূলত শান্তি, আত্মশুদ্ধি এবং বছরের শ্রেষ্ঠ ইবাদত ‘হজ’-এর প্রস্তুতির মাস। এই মাসকে কেন্দ্র করে মুমিন হৃদয়ে ইবাদতের নবজাগরণ শুরু হয়।
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মাসের বিশেষ মর্যাদা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি... তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (মাস)।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
রাসুলুল্লাহ (স.) বিদায় হজের ভাষণে ইরশাদ করেছেন- ‘তিনটি মাস ধারাবাহিক- জিলকদ, জিলহজ ও মহররম; এবং অন্যটি হলো রজব।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৬২; মুসলিম: ১৬৭৯)
আরও পড়ুন: হজযাত্রীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও করণীয়
সম্মানিত মাস হওয়ায় এই সময়ে আলেমদের মতে, নেক আমলের সওয়াব অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।
১. অধিক হারে নফল ইবাদত: নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির বৃদ্ধি করা।
২. নফল রোজা পালন: প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং বিশেষ করে আইয়ামে বিজ (চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা রাখা।
৩. তাওবা ও ইস্তেগফার: বিগত জীবনের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
৪. হজের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি: যারা এ বছর হজে যাচ্ছেন, তাদের জন্য হজের মাসায়েল শেখা ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণের এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।
৫. কোরবানির আগাম পরিকল্পনা: সাধ্য অনুযায়ী অর্থ সঞ্চয়, পশুর প্রাথমিক খোঁজ নেওয়া এবং নিয়তকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা।
৬. হক আদায় ও ঋণ পরিশোধ: কারো পাওনা থাকলে তা পরিশোধ করা অথবা কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক জোরদার করা।
৭. তাকওয়ার অনুশীলন: প্রতিটি কাজে আল্লাহভীতি বা ‘তাকওয়া’র চর্চা করা, যা জিলহজ মাসের বড় ইবাদতগুলোর মূল ভিত্তি।
আরও পড়ুন: মকবুল হজের জন্য যেসব শর্ত ও মাসয়ালা জানা জরুরি
জিলকদ মাসকে কেন্দ্র করে গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা এবং প্রচলিত কিছু বানোয়াট আমল ও ভ্রান্ত বিশ্বাস বর্জন করা জরুরি-
নিজেদের ওপর জুলুম না করা: আল্লাহ বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন- ‘সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে (গুনাহের মাধ্যমে) নিজেদের ওপর জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
ভিত্তিহীন ও মনগড়া আমল পরিহার: ‘বার চান্দের আমল’ জাতীয় কিছু অনির্ভরযোগ্য বইয়ে এ মাসের প্রথম রাতে বা বিভিন্ন দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক সুরা ইখলাসসহ বিশেষ পদ্ধতির নামাজের কথা উল্লেখ আছে। এ জাতীয় বইয়ের আমল শরিয়তের দলিল নয়, বরং যাচাই ছাড়া প্রচলিত লোকমুখের ধারণা মাত্র। এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস না থাকায় বিশেষ নিয়মের এসব ইবাদত ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হিসেবে গণ্য (তথ্যসূত্র: আল-আসারুল মারফুআ: ৮)
জাল আমলের বিশ্বাস থেকে মুক্তি: ‘একদিন রোজা রাখলে মকবুল হজের সওয়াব’ বা ‘সোমবার রোজা রাখলে এক হাজার বছরের ইবাদতের নেকি’- এজাতীয় বর্ণনাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সুন্নাহসম্মত নফল ইবাদত করা যাবে, কিন্তু ভিত্তিহীন সওয়াবের আশা করা যাবে না।
কুসংস্কার ও অশুভ ধারণা: জিলকদ মাসে বিয়ে-শাদি বা সফর করা অশুভ এমন ধারণা পোষণ করা গুনাহ। রাসুল (স.) নিজে এই মাসেই ওমরা করেছেন।
অপচয় ও লোকদেখানো মানসিকতা: হজ বা কোরবানির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার রিয়া (লোকদেখানো ভাব) বা অপব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে।
জিলকদ আমাদের জানায়, কীভাবে একটি বড় ইবাদতের (হজ ও কোরবানি) জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। ইবাদতের বসন্তকাল জিলহজ আসার পূর্বে এটি আমাদের হৃদয়ের ভূমিকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে উর্বর করার সুযোগ দেয়। তাই এই মাস মুমিনের জন্য নিজেকে সংশোধন করার এক বিশেষ মওসুম। একে আত্মশুদ্ধি ও প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। কলহ-বিবাদ পরিহার করে সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।