images

ইসলাম

মনোযোগ দিয়ে শোনা: ইবাদত ও প্রজ্ঞার অনন্য রূপ

ধর্ম ডেস্ক

১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

আমরা কি সত্যিই একে অপরের কথা শুনি, নাকি শুধু নিজের কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় থাকি? আজকের বিশ্বে আমরা বলতে যতটা আগ্রহী, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে ততটাই অনাগ্রহী। অথচ ইসলামি জীবনদর্শনে মনোযোগী শ্রবণ জ্ঞানঅর্জন ও হেদায়েত লাভের অন্যতম মাধ্যম। একটি প্রচলিত প্রজ্ঞাবাক্য আছে যে, মানুষকে একটি মুখ ও দুটি কান দেওয়া হয়েছে, যেন সে বেশি শোনে এবং কম বলে। ইসলামি জীবনদর্শনও আমাদের সেই পরম সত্যের দিকেই আহ্বান জানায়।

স্রষ্টা যখন শ্রেষ্ঠ শ্রোতা

আল্লাহ তাআলা ‘আস-সামীউ’ বা সর্বশ্রোতা। শোনার গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআনে এমনকি ইবলিসের মতো অভিশপ্ত সত্তার কথাও ধৈর্যের সঙ্গে শোনার বর্ণনা পাওয়া যায়। সুরা মুজাদালাহ-এর সূচনাই হয়েছে এক সাধারণ নারীর অভিযোগ শোনাকে কেন্দ্র করে, যার আরজি সরাসরি আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। স্রষ্টা যখন সৃষ্টির কথা শোনেন, তখন মানুষের জন্য অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা কেবল ভদ্রতা নয়; এটি মহান রবের গুণের এক ক্ষুদ্র প্রতিফলন এবং নৈতিক দায়িত্ব।

কোরআনের সতর্কবাণী ও রহমতের শর্ত

কোরআন মজিদে সেই সব মানুষের নিন্দা করা হয়েছে, যারা শুনেও না শোনার ভান করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা বলে, ‘আমরা শুনেছি’, অথচ তারা শোনে না।’ (সুরা আনফাল: ২১) আরও ইরশাদ হয়েছে- ‘যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা আরাফ: ২০৪) এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, মনোযোগ দিয়ে শোনা আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভের অন্যতম একটি শর্ত।

আরও পড়ুন: অপ্রীতিকর আচরণ যেভাবে মোকাবেলা করতেন নবীজি

মহানবীর (স.) অনন্য শ্রবণ উদারতা

রাসুলুল্লাহ (স.) ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিনয়ী শ্রোতা। তিনি কারো কথা শোনার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিতেন এবং অযথা কাউকে থামাতেন না। মক্কার নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া যখন নানা প্রলোভন ও আপত্তিকর প্রস্তাব দিচ্ছিল, নবীজি (স.) ধৈর্যসহকারে সব শুনলেন। তার কথা শেষ হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবুল ওয়ালিদ, আপনার কথা কি শেষ হয়েছে?’। এমনকি রূঢ় আচরণকারী ব্যক্তির কথাও তিনি সহমর্মিতার সঙ্গে শুনতেন। মুনাফিকরা তাঁর এই অতিরিক্ত শ্রবণ-উদারতা নিয়ে বিদ্রূপ করলে আল্লাহ প্রতিবাদ করে বলেন, ‘তাঁর কান তোমাদের জন্য যা মঙ্গল তা-ই শুনে।’ (সুরা তওবা: ৬১)

পারিবারিক ও সামাজিক সংকট নিরসন

আজকের দিনের বহু পারিবারিক সংকট ও প্রজন্মগত দূরত্ব তৈরি হচ্ছে একে অপরের কথা না শোনার কারণে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন সন্তান কথা শোনে না; কিন্তু তারা কি সন্তানের অনুভূতি, আবেগ ও প্রশ্নগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন? ইসলাম আমাদের ‘সক্রিয় শ্রবণ’-এর শিক্ষা দেয়। বড়রা ছোটদের শুনবে, ছোটরা বড়দের- এই পারস্পরিক শ্রবণই সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং সমাজে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে।

আরও পড়ুন: মানবতার শিক্ষক বিশ্বনবী (স.)

জ্ঞানার্জনের প্রথম ধাপ: নীরবতা ও একাগ্রতা

সলফে সালেহিন বা পূর্বসূরী মনীষীদের কাছে জ্ঞানার্জনের সূচনা ছিল নীরবতা ও একাগ্রতা। তাবেয়ি আতা (রহ.) বলতেন, ‘কোনো যুবক যখন আমার কাছে কিছু বলে, আমি এমনভাবে শুনি যেন আগে কখনো তা শুনিনি, যদিও তা আমি বহু আগেই জেনেছি।’ এই বিনয় ও শ্রবণ-মনোভাবই একজন মানুষকে প্রকৃত প্রজ্ঞাবান করে তোলে।

জুমার খুতবা ও সামাজিক শৃঙ্খলা

ইসলামে জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় কথা বলা তো দূরের কথা, অন্যকে ‘চুপ করো’ বলাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি আমাদের শেখায়- যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলে, তখন পূর্ণ একাগ্রতা বজায় রাখা একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়।

সঠিক জ্ঞান ও হেদায়েত লাভের প্রথম শর্তই হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। আল্লাহ তাআলা তাদেরই প্রশংসা করেছেন, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্য থেকে উত্তমটি গ্রহণ করে। (সুরা জুমার: ১৮) তাই আসুন, আমরা সচেতনভাবে মনোযোগী শ্রবণের চর্চা করি- পরিবারে, সমাজে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। হয়তো আমাদের একটি মনোযোগী শ্রবণই কারো হৃদয়ে আলো জ্বালাতে পারে, মুছে দিতে পারে দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি।