images

ইসলাম

কথাবার্তায় শিরক: শব্দচয়নে ঈমানি সতর্কতা

ধর্ম ডেস্ক

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে জিহ্বা সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক। এটি যেমন মানুষকে জান্নাতের উচ্চ মাকামে পৌঁছে দিতে পারে, তেমনি সামান্য অসতর্কতায় এটি নিক্ষিপ্ত করতে পারে জাহান্নামের অতল গহ্বরে। মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষ যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তখন শরীরের সকল অঙ্গ জিহ্বাকে বিনীতভাবে বলে- ‘তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। আমরা তো তোমার সাথে সম্পৃক্ত। তুমি যদি সোজা পথে দৃঢ় থাকো তাহলে আমরাও দৃঢ় থাকতে পারি। আর তুমি যদি বাঁকা পথে যাও তাহলে আমরাও বাঁকা পথে যেতে বাধ্য।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪০৭)

শিরকের সংজ্ঞা ও ভয়াবহতা

শিরক শব্দের অর্থ হলো- অংশীদার করা, মিশ্রণ বা অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়- আল্লাহর সত্তা, গুণ বা তাঁর কর্মের সাথে অন্যকাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করাকে শিরক বলা হয়। এটি এতটাই ভয়াবহ যে, একে ধ্বংসকারী কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বস্তু থেকে বেঁচে থাকো। (তার মধ্যে প্রথমটি হলো) আল্লাহর সঙ্গে শিরক তথা অংশীদার স্থাপন করা’ (সহিহ বুখারি)
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, শিরক কেবল মূর্তিপূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কথাবার্তা, নিয়ত ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে শরিক করা মহা জুলুম।’ (সুরা লোকমান: ১৩)

দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রচলিত কিছু শিরক

আমাদের সমাজে প্রচলিত এমন কিছু বাক্য ও অভ্যাস নিচে তুলে ধরা হলো, যা তাওহিদি আকিদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক-

১. আল্লাহ ছাড়া অন্যকারো নামে শপথ: অনেকে কথায় কথায় মা-বাবা, সন্তান, জীবন বা কাবার কসম খেয়ে থাকেন। হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করল, সে শিরক করল’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩২৫১) শরিয়তের বিধান হলো- শপথ কেবল আল্লাহর নামেই হতে হবে।

আরও পড়ুন: না বুঝে শিরক করলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন?

২. আল্লাহ ও সৃষ্টিকে একই কাতারে রাখা: ‘উপরে খোদা নিচে আপনি’ বা ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চান তা-ই হবে’ এ জাতীয় বাক্য শব্দগত শিরকের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি মুহাম্মদ (স.)-কে বললেন, ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চান।’ আল্লাহর রাসুল সাথেসাথে তাকে সংশোধন করে বললেন, ‘তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে? বরং বলো- আল্লাহ এককভাবে যা চান’ (মুসনাদে আহমদ: ১৮৩৯)

৩. মাধ্যমকে (ওসিলা) মূল কর্তা মনে করা: বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর আমরা বলি, ‘ডাক্তার না থাকলে আজ রোগীটি বাঁচত না’ কিংবা ‘ড্রাইভারের দক্ষতায় আজ বেঁচে গেলাম।’ এখানে ডাক্তার বা ড্রাইভার কেবল মাধ্যম মাত্র। মুহাম্মদ (স.) এই জাতীয় শব্দচয়ন সংশোধন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘তোমরা বলো না- আল্লাহ যা চান এবং অমুক যা চায়; বরং বলো- আল্লাহ যা চান, তারপর অমুক যা চায়’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৮০) অর্থাৎ মাধ্যমকে পরে উল্লেখ করতে হবে।

৪. গায়েবি মদদ ও অদৃশ্যের খবর নিয়ে ভ্রান্ত বিশ্বাস: কোনো পীর-বুজুর্গকে দূরদেশ থেকে ডাকা এবং মনে করা যে তিনি তা সরাসরি শুনতে পাচ্ছেন- এটি শিরক। কারণ সর্বশ্রোতা কেবল আল্লাহ। এছাড়া জ্যোতিষী বা গণকদের কাছে গিয়ে অদৃষ্টের কথা জিজ্ঞেস করাও ঈমানবিধ্বংসী কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া অন্যকোনো ইলাহকে ডেকো না... বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (সুরা কাসাস: ৮৮)

৫. সময় বা ভাগ্যকে গালি দেওয়া: ব্যর্থতা বা বিপদে পড়লে আমরা ‘নিষ্ঠুর সময়’ বা ‘অভিশপ্ত ভাগ্য’কে দোষারোপ করি। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। তারা জামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই জামানা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি।’ (সহিহ বুখারি: ৪৮২৬)

৬. অশুভ ও কুলক্ষণ বিশ্বাস করা: ‘অমুকের মুখ দেখে যাত্রা শুরু করলে অমঙ্গল হবে’ বা কোনো দিন-ক্ষণকে অশুভ মনে করা জাহেলি যুগের বিশ্বাস। রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘কোনো বস্তুকে কুলক্ষণ মনে করা শিরক, কোনো বস্তুকে কুলক্ষণ ভাবা শিরক।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৯১০)

আরও পড়ুন: জানা-অজানা শিরক থেকে বাঁচার দোয়া

শিরকের প্রকৃতি ও প্রতিকার

কথাবার্তায় এই শিরকগুলো সাধারণত ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তবে যদি কেউ বিশ্বাস করে যে ওই মাধ্যমটিই স্বতন্ত্রভাবে কোনো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে, তবে তা বড় শিরকে রূপান্তরিত হয়ে ঈমান নষ্ট করে দেয়।

বাঁচার উপায়

১. জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি বাক্য বলার আগে তার অর্থ ও ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা।
২. তওবা ও ঈমান নবায়ন: যদি ভুলে কোনো শিরকি বাক্য মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, তবে দ্রুত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা এবং কালিমা পাঠের মাধ্যমে নিজের ঈমান নবায়ন করা।
৩. নবীজি (স.)-এর শেখানো দোয়া পড়া: মুহাম্মদ (স.) এই দোয়াটি বেশি পড়তেন- ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, ছাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক’ (হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন)।

আত্মপরীক্ষা

আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন- আমরা কি প্রতিদিন এমন কোনো শব্দ বলছি, যা তাওহিদের সাথে সাংঘর্ষিক? তাওহিদ কেবল অন্তরের বিশ্বাসের নাম নয়, এটি আমাদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে প্রতিফলিত হতে হবে। একটি অসতর্ক শব্দ পাহাড় সমান আমলকে অর্থহীন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে, জিহ্বার ছোট একটি ভুল, ঈমানের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আসুন, আমরা আমাদের জিহ্বাকে তাওহিদের রঙে রাঙাই এবং কথাবার্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি।