ধর্ম ডেস্ক
১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
আধুনিক বিশ্বে রাজনীতি অনেকাংশে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের কৌশলী খেলায় পরিণত হলেও ইসলামি দৃষ্টিতে এর প্রকৃত নাম ‘সিয়াসাত’, যার মূল অর্থ সংশোধন, জনকল্যাণ ও ন্যায়ভিত্তিক পরিচালনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ‘সিয়াসাতে ঈমানি’ ধারণার উদ্ভব- যার ভিত্তি হলো সত্যবাদিতা, তাকওয়া ও আমানতদারিতা। পক্ষান্তরে, ‘মিথ্যার রাজনীতি’ হলো জনমত প্রভাবিত করতে প্রতারণা ও অপপ্রচারের আশ্রয় নেওয়া, যা ইসলামি নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
রাজনীতিতে মিথ্যার ব্যবহার যেমন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ভিত্তিহীন অপবাদ ও প্রোপাগান্ডা- শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং এটি সমাজে চরম অবিশ্বাস ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুনাফেকের আলামত তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয় তা খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিস প্রমাণ করে, রাজনৈতিক মিথ্যাচার কেবল কৌশল নয়; এটি মুনাফেকির স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য। যখন কোনো নেতা জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা আশ্বাস দেন, তখন তিনি মূলত কোটি মানুষের আমানতের খেয়ানত করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের হেদায়েত দেন না।’ (সুরা জুমার: ৩)
আরও পড়ুন: রাজনৈতিক সংকটে ইনসাফ ও সহনশীলতা: ইসলামের ৮ নীতি
সিয়াসাতে ঈমানির মূল চালিকাশক্তি হলো সত্য ও ন্যায়। এখানে সাফল্যের মাপকাঠি কেবল শাসনক্ষমতা নয়, বরং নৈতিকতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা তাওবা: ১১৯) ঈমানি রাজনীতি পরিচালিত হলে সেখানে সত্য গোপন করার কোনো সুযোগ থাকে না এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়ে দাঁড়ায় এক অনন্য ধর্মীয় কর্তব্য। এর ফলে নেতার কাছে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। হজরত আবু বকর (রা.) খেলাফতের শুরুতে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি সঠিক পথে থাকলে আমাকে সাহায্য করো, আর ভুল করলে আমাকে সংশোধন করো।’ এটিই হলো জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের সর্বোত্তম আদর্শ।
ইসলামে ক্ষমতা কোনো বিশেষাধিকার নয়; এটি একটি গুরুভার ও আমানত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দিতে...।’ (সুরা নিসা: ৫৮) রাসুলুল্লাহ (স.) দায়বদ্ধতা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে (কেয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, শাসক জনগণের মালিক নন বরং সেবক। নেতৃত্ব বা শাসনক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়, বরং কঠিন এক জবাবদিহিতার মাধ্যম।
আরও পড়ুন: শাসক, পদ-পদবি সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
মিথ্যার রাজনীতির অন্যতম অস্ত্র হলো প্রতিপক্ষকে দমনে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার। কিন্তু ইসলাম এ ক্ষেত্রে আপসহীন ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআন বলছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ না করতে প্ররোচিত না করে। ইনসাফ করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা: ৮) এটি প্রমাণ করে যে, ন্যায়বিচার কোনো দল বা ব্যক্তির অনুরাগের ওপর নয়, বাস্তবে এটি একটি সর্বজনীন খোদায়ী বিধান।
সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থার সংকটের প্রধান কারণ হলো সত্য থেকে বিচ্যুতি। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গুজব ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সম্পূর্ণ পরিহার করে রাষ্ট্রীয় পদ ও সম্পদকে পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করা জরুরি। একইসাথে ভুল স্বীকার ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্ষমতার মোহের চেয়ে জনগণের সেবাকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কেবল তখনই সমাজে অনাস্থা দূর হয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি সাময়িকভাবে সফল মনে হলেও তা কখনো টেকসই শান্তি বা সম্মান বয়ে আনে না। বিপরীতে, ‘সিয়াসাতে ঈমানি’ সত্য ও আমানতদারিতার ভিত্তিতে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করে। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়- রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি একটি পবিত্র আমানত, যার চূড়ান্ত হিসাব হবে মহান আল্লাহর দরবারে।