রাজনীতি যখন অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সমাজ তার নৈতিক ভারসাম্য হারায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মানুষ যখন পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। ইসলাম রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখে না, বরং একে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার একটি পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করে।
বৈচিত্র্য ও মতভেদ: এক শাশ্বত বাস্তবতা
ইসলাম মানুষের চিন্তার ভিন্নতাকে অস্বীকার করে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি আপনার প্রতিপালক চাইতেন, তবে তিনি মানুষকে এক জাতিই করতেন; কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।’ (সুরা হুদ: ১১৮) এই আয়াত প্রমাণ করে, মতের বৈচিত্র্য কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সত্য অন্বেষণের এক পরীক্ষা। ফলে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে নির্মূল করার চেষ্টা ইসলামের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলামে গঠনমূলক ‘মতপার্থক্য’ (ইখতিলাফ) গ্রহণযোগ্য হলেও উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরায় এমন ‘বিভেদ’ (ইফতিরাক) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আরও পড়ুন: নবীজির মহামূল্যবান ১৪ অসিয়ত
ইনসাফ: রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য শর্ত
ইসলামের রাজনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার বা ইনসাফ। পবিত্র কোরআন নির্দেশ দেয়- কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অবিচারে প্ররোচিত না করে। (সুরা মায়েদা: ৮) রাজনৈতিক বিরোধিতা কখনোই অবিচারের বৈধতা দিতে পারে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখেন যদিও তা অবিশ্বাসী হয়; আর জুলুমের রাষ্ট্রকে ধ্বংস করেন যদিও তা বিশ্বাসীদের হয়।’ অর্থাৎ, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দমন-পীড়নের সুযোগ নয়, বরং তা জনগণের নিরাপত্তা ও ইনসাফ নিশ্চিত করার দায়িত্ব মাত্র।
বিজ্ঞাপন
মতপার্থক্য নিরসনে ইসলামের দিকনির্দেশনা
সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে ইসলামের আটটি নীতি অত্যন্ত কার্যকর-
১. চূড়ান্ত ফয়সালাকারী আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.): রাজনৈতিক বিরোধে ব্যক্তিগত জেদ বা দলীয় অবস্থানের চেয়ে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়াই ঈমানের দাবি।
২. ঐক্যের রজ্জু ধারণ: মতভেদ থাকলেও হৃদয়ের বন্ধন অটুট রাখা জরুরি। বিভেদ সৃষ্টি করাকে ইসলামে ‘ফিতনা’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
৩. গবেষণালব্ধ ভিন্নমতের স্বীকৃতি: যেসব বিষয়ে সরাসরি বিধান নেই, সেখানে আলেমদের গবেষণালব্ধ ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে। যেমন বনু কুরায়জার ঘটনায় সাহাবিদের মতভেদকে নবীজি (স.) অনুমোদন দিয়েছিলেন।
৪. পরমতসহিষ্ণুতা: নিজের মতকেই চূড়ান্ত ধ্রুব সত্য মনে করা উচিত নয়। হজরত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক জ্ঞানের বাইরেও কোনো সিদ্ধান্তের ভিন্ন যৌক্তিকতা থাকতে পারে।
৫. পরামর্শ বা শূরা: বিতর্ক নয়, বরং আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। আলোচনার ভাষা হতে হবে মার্জিত ও আক্রমণমুক্ত।
৬. দলিলের প্রাধান্য: আবেগ বা অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং শক্তিশালী দলিল ও যুক্তির অনুসরণই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ।
৭. ব্যক্তিস্বার্থ ও বিদ্বেষ পরিহার: বিরোধের মূলে থাকা ‘ইগো’ বা অহংবোধ ত্যাগ করতে হবে। মুমিন হবে একে অপরের জন্য আয়নার মতো, যে শত্রুতা নয় বরং দরদ দিয়ে ভুল শুধরে দেবে।
৮. বৃহত্তর কল্যাণ (মাসলাহাহ): বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কখনো কখনো ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করাই ইসলামের প্রকৃত দূরদর্শিতা। হুদায়বিয়ার সন্ধি এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আরও পড়ুন: আল্লাহ মুসলিমদের জন্য কোন আদর্শ নির্ধারণ করেছেন?
মদিনা রাষ্ট্র: সহনশীলতার অনন্য দলিল
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর মদিনা রাষ্ট্র ছিল রাজনৈতিক সহনশীলতার শ্রেষ্ঠ বাস্তব দৃষ্টান্ত। মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিম-অমুসলিম সব সম্প্রদায়ের অধিকার স্বীকৃত ছিল। নবীজি (স.) ঘোষণা করেছিলেন, কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রতি জুলুম করলে কিয়ামতের দিন তিনি নিজেই মজলুমের পক্ষে মামলা করবেন। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যে দমন-পীড়নের লাইসেন্স নয়, এটি তাঁর অন্যতম বড় প্রমাণ।
ইনসাফই হোক রাজনীতির চালিকাশক্তি
ইসলামের রাজনৈতিক নীতি কোনো সাময়িক কৌশল নয়, বরং একটি স্থায়ী নৈতিক বাধ্যবাধকতা। কটু বক্তব্য, অপমান ও উসকানি সমাজকে বিভক্ত করে, আর সহনশীলতা সমাজকে সংহত করে। বর্তমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শক্ত অবস্থানে থেকেও কিভাবে সহনশীল থাকা যায় এবং বিরোধিতার মাঝেও কিভাবে ইনসাফ বজায় রাখা যায়- তা শেখাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইনসাফই ইতিহাসে রাষ্ট্র ও জাতিকে বাঁচিয়ে রাখে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ন্যায়, ইনসাফ আর সহনশীল রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




