images

ইসলাম

নিয়ত করতে ভুলে গেলে হজ সহিহ হবে?

ধর্ম ডেস্ক

১২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

ইসলামি শরিয়তে যেকোনো ইবাদত কবুল হওয়ার মৌলিক ভিত্তি হলো ‘নিয়ত’। নিয়ত মূলত অন্তরের সংকল্প, যা একটি সাধারণ কাজকে ইবাদতে রূপ দেয়। হজের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রতিটি কার্যাবলীর পেছনে নিয়ত থাকা অপরিহার্য। নিয়ত ছাড়া বা ভুলে নিয়ত না করলে হজ আদায় হবে কি না- নিচে তার দালিলিক বিশ্লেষণ পেশ করা হলো।

নিয়তের গুরুত্ব

হজের ক্ষেত্রে নিয়ত যে অত্যাবশ্যক, তা কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- ‘আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ ও ওমরা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা: ১৯৬)
এখানে 'আল্লাহর জন্য' কথাটি দ্বারা নিয়ত ও ঐকান্তিক সংকল্পকে নির্দেশ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পাবে যার সে নিয়ত করবে।’ (সহিহ বুখারি: ১; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)

হজের নিয়তের শরয়ি অবস্থান (ফিকহি বিশ্লেষণ)

ইমামগণের মতে নিয়ত ছাড়া হজ সম্পন্ন হয় না, তবে এর সংজ্ঞায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে-
হানাফি মাজহাব: ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে, নিয়ত ও তালবিয়া হলো ইহরামের ‘শর্ত’। শর্ত ছাড়া যেমন নামাজ হয় না, তেমনি নিয়ত ছাড়া ইহরাম শুরু হয় না।
শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব: তাদের মতে নিয়ত হলো হজের একটি ‘রুকন’ বা ফরজ অংশ। রুকন বাদ পড়লে ইবাদত বাতিল হয়ে যায়।
সারকথা হলো, সকল মাজহাবের মতেই নিয়ত ছাড়া হজ সহিহ নয়।

আরও পড়ুন: হজের নিয়ত কখন কীভাবে করতে হয়?

নিয়ত ভুলে যাওয়ার বিভিন্ন অবস্থা ও তার বিধান

ক. অন্তরে সংকল্প আছে কিন্তু মুখে বলতে ভুলে যাওয়া: নিয়ত মূলত অন্তরের বিষয়; মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত বা মোস্তাহাব। যদি কারো মনে হজ করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকে এবং সেই অনুযায়ী তিনি ইহরামের কাপড় পরেন ও তালবিয়া পাঠ করেন, তবে তার হজ ১০০% সহিহ হবে। মুখে উচ্চারণ করতে ভুলে গেলে হজের কোনো ক্ষতি হবে না।
খ. মিকাত পার হওয়ার সময় নিয়ত করতে একদম ভুলে যাওয়া: যদি কেউ মিকাত (নির্ধারিত সীমা) অতিক্রম করার সময় হজের কোনো প্রকার নিয়ত না করেন এবং ইহরাম না বাঁধেন, তবে তার ইহরামই সম্পন্ন হয়নি।
সমাধান: এক্ষেত্রে তাকে পুনরায় মিকাতে ফিরে গিয়ে নিয়ত করে আসতে হবে। যদি তিনি মিকাতে ফিরে না গিয়ে হজের কাজ শুরু করেন, তবে হজ হয়ে যাবে কিন্তু মিকাত লঙ্ঘনের কারণে তাকে একটি ‘দম’ বা কোরবানি কাফফারা হিসেবে দিতে হবে। (ফতোয়ায়ে শামি, আল-বাহরুর রায়েক)
গ. হজের প্রকার (তামাত্তু, ইফরাদ বা কিরান) নির্ধারণে ভুল হওয়া: কেউ যদি হজের নিয়ত করেছেন কিন্তু কোন প্রকারের হজ করবেন তা নির্দিষ্ট করতে ভুলে যান, তবে তার হজ বাতিল হবে না। তিনি ইহরাম অবস্থায় পরবর্তীতে যেকোনো একটি প্রকার বেছে নিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।
ঘ. সম্পূর্ণ নিয়ত ছাড়া হজের কার্যাবলী সম্পাদন করা: যদি কোনো ব্যক্তি হজের পুরো সময়টাই এমনভাবে পার করেন যে তার অন্তরে হজের কোনো সংকল্পই ছিল না, তবে তার হজ সহিহ হবে না। কারণ নিয়ত ছাড়া হজের কাজগুলো কেবল সাধারণ ভ্রমণ হিসেবে গণ্য হবে, ইবাদত হিসেবে নয়।

আরও পড়ুন: হজে যেসব ভুল থেকে সতর্কতা কাম্য

ফিকহশাস্ত্রের সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী: নিয়ত ও তালবিয়া ছাড়া ইহরাম শুরুই হয় না।
শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী: নিয়ত হজের রুকন, যা বাদ পড়লে হজ বাতিল।
বাস্তব সিদ্ধান্ত: মুখে বলা বড় কথা নয়, অন্তরের সংকল্প থাকলে হজ হয়ে যাবে। আর মিকাত পার হওয়ার পর নিয়ত করলে হজ হবে কিন্তু জরিমানা (দম) দিতে হবে।

পরামর্শ

নিয়ত করতে ভুলে যাওয়ার বিষয়টি যদি কেবল ‘মুখে বলা’র ক্ষেত্রে হয়, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই- হজ সহিহ হবে। কিন্তু যদি হজের মূল সংকল্প বা ইহরামের বিষয়টিই বাদ পড়ে যায়, তবে হজ ত্রুটিযুক্ত হবে। হজ পালনের আগে মিকাত ও ইহরামের মাসয়ালাগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া এবং কোনো ভুল হয়ে গেলে দ্রুত বিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ নিয়ে ‘দম’ বা কাফফারার বিধান জেনে নেওয়া জরুরি।