images

ইসলাম

ইতিহাসের কালো অধ্যায়: জালেমদের দম্ভ ও খোদায়ি বিচার

ধর্ম ডেস্ক

০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম

পৃথিবীর ইতিহাস যেমন সত্য ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকায় উজ্জ্বল, তেমনি ক্ষমতার দম্ভ আর জুলুমের কালো অধ্যায়েও কলঙ্কিত। ‘জুলুম’ ইসলামের দৃষ্টিতে এক ভয়াবহ অপরাধ। যুগে যুগে বহু প্রতাপশালী শাসক ও ব্যক্তি নিজেদের অপরাজেয় মনে করে নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও ইতিহাসের পাতা সাক্ষী দেয়- জালেমরা সাময়িক প্রতাপ দেখালেও তাদের চূড়ান্ত পতন হয়েছে অত্যন্ত লাঞ্ছনাকর ও ধ্বংসাত্মক।

জুলুমের স্বরূপ ও খোদায়ি হুঁশিয়ারি

ইসলামি আকিদায় জুলুমের পরিণাম ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই ভয়াবহ। রাসুলে কারিম (স.) বলেছেন, ‘মজলুমের দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।’ (সহিহ বুখারি) আল্লাহ তাআলা জালিমকে তাৎক্ষণিক শাস্তি না দিয়ে অনেক সময় অবকাশ দেন, কিন্তু যখন তিনি ধরেন, তখন আর ছাড়েন না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনি কখনো মনে করবেন না যে, জালেমরা যা করছে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৪২)

ইতিহাসের কুখ্যাত জালেম ও তাদের পতন

১. ফেরাউন ও হামান: দম্ভ ও সহযোগী শক্তির পতন
বনি ইসরাঈলের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো ফেরাউন নিজেকে ‘সর্বোচ্চ রব’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কোরআনের ভাষায়, সে ছিল পৃথিবীতে এক চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারী। তার এই জুলুমের শাসনে প্রধান সহযোগী ছিল তার মন্ত্রী হামান, যে অত্যাচারী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া ছিল। লোহিত সাগরের উত্তাল তরঙ্গ ফেরাউনকে তার বিশাল বাহিনীসহ গ্রাস করে নেয়। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের দেহকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে রক্ষা করার ঘোষণা দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি পরবর্তীকালের মানুষের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো।’ (সুরা ইউনুস: ৯২)

আরও পড়ুন: 'চোখে দেখবই আল্লাহকে!' বনি ইসরাইলের সেই অহংকারের পরিণতি

২. নমরুদ: এক ক্ষুদ্র প্রাণীর কাছে পরাজয়
নমরুদ ছিল তৎকালীন সময়ের প্রতাপশালী সম্রাট, যে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। সে নিজেকে জীবন ও মৃত্যুর মালিক বলে দাবি করার ধৃষ্টতা দেখায়। অথচ আল্লাহ তাআলা এক অতি ক্ষুদ্র সৃষ্টির মাধ্যমে তার অসহ্য যন্ত্রণা ও করুণ মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির সামনে মানুষের দম্ভ কতটুকু নগণ্য।

৩. কারুন: সম্পদের দম্ভ যখন অভিশাপ
কারুন ছিল ঐশ্বর্যের অহংকারে মত্ত এক জালেম। সে বিশ্বাস করত, তার অঢেল সম্পদ কেবল তার ব্যক্তিগত মেধার ফল। মুসা (আ.)-এর প্রতি অবজ্ঞা ও সাধারণ মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার কারণে আল্লাহ তাকে তার সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন। কোরআনে একে পরবর্তী ধনকুবের জালেমদের জন্য এক বড় শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

৪. আবু জাহেল: এই উম্মতের ফেরাউন
নবুয়তের সূচনালগ্নে মক্কার মুমিনদের ওপর নির্মম নির্যাতনের প্রধান খলনায়ক ছিল আবু জাহেল। ইসলামের প্রথম শহীদ হজরত সুমাইয়া (রা.)-কে সে নির্মমভাবে শহীদ করে। রাসুলে কারিম (স.) তাকে ‘এই উম্মতের ফেরাউন’ বলে অভিহিত করেছেন। সত্যের এই চরম শত্রুকে বদরের যুদ্ধে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে দুই কিশোর সাহাবীর হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

আরও পড়ুন: জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর ওয়াদা 

মজলুমের দীর্ঘশ্বাস ও প্রকৃতির বিচার

জুলুম পৃথিবীতে বিপর্যয়ের মূল কারণ। যখন সমাজে ইনসাফ বিদায় নেয় এবং দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার বাড়ে, তখন সেখানে আল্লাহর গজব নেমে আসে। আল্লাহ বলেন, ‘স্থল ও জলে বিপর্যয় মানুষের কর্মের ফলস্বরূপ।’ (সুরা রুম: ৪১) জালেমের হাত যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর বিচারের কাছে তা বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে।

ইতিহাসের এই বড় জালেমদের কাহিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সতর্কবার্তা। ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা প্রতিপত্তি- কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। জালেমরা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়, আর সত্যের বিজয় একসময় সুনিশ্চিত হয়। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত জুলুম থেকে বিরত থাকা এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।