images

ইসলাম

মৃতব্যক্তির ফেসবুক-ইউটিউব কি ‘উত্তরাধিকার’ হিসেবে গণ্য হবে? 

ধর্ম ডেস্ক

০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি ‘ডিজিটাল সম্পদ’ বা ‘ডিজিটাল অ্যাসেট’ এখন এক বাস্তব সত্য। বর্তমানে অনেক জনপ্রিয় ইউটিউবার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাদের চ্যানেল বা পেজ থেকে নিয়মিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়, এমনকি বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তার রেখে যাওয়া এসব ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মালিক কে হবেন? এখান থেকে প্রাপ্ত আয় কি শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে?
এ বিষয়ে ইসলামের ফিকহশাস্ত্র, উত্তরাধিকার আইন এবং সমসাময়িক ফতোয়া বোর্ডগুলোর আলোকে দালিলিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ডিজিটাল সম্পদ কি ‘মাল’ বা সম্পত্তি?

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোনো কিছু উত্তরাধিকার (মিরাস) হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য সেটিকে ‘মাল’ (Property) বা ‘হক্বে মালী’ (আর্থিক অধিকার) হতে হয়। ফিকহের মূলনীতি হলো- ‘যার আর্থিক মূল্য আছে এবং যা বৈধভাবে ব্যবহার ও সংরক্ষণযোগ্য, সেটিই সম্পদ।’
জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি (ওআইসি) তাদের ৪৩ (৫/৫) নম্বর প্রস্তাবে উল্লেখ করেছে যে, মেধাস্বত্ব (Intellectual Property), ট্রেডমার্ক এবং ডিজিটাল সত্তার আর্থিক মূল্য রয়েছে; তাই এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে সংরক্ষিত সম্পদ। সুতরাং একটি মনিটাইজড ইউটিউব চ্যানেল বা ফেসবুক পেজ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ‘তারেকা’ (تركة) বা পরিত্যক্ত সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

আরও পড়ুন: মৃত্যু আসার আগে যেসব কাজ দ্রুত শেষ করবেন

২. আয়ের উৎসের বৈধতা: প্রথম ও প্রধান শর্ত

ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে প্রাপ্ত আয় উত্তরাধিকারীরা ভোগ করতে পারবেন কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের বৈধতার ওপর। যদি চ্যানেলের কনটেন্ট হালাল হয়- যেমন ইসলামি আলোচনা, শিক্ষামূলক তথ্য, প্রযুক্তি, রান্নাবান্না বা জনকল্যাণমূলক ভিডিও, তাহলে সেই আয় বৈধ (হালাল) এবং তা উত্তরাধিকারীরা শরিয়াহ অনুযায়ী বণ্টন করে নিতে পারবেন।
অন্যদিকে, যদি কনটেন্টে অশ্লীলতা, অনৈতিক বিনোদন বা আকীদাবিরোধী বিষয় থাকে, তবে সেই আয় ‘খবীস’ বা অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের দায়িত্ব হবে- গুনাহ থেকে বাঁচতে ওই কনটেন্ট অপসারণ করা বা প্রয়োজনে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, এসব কনটেন্ট চালু থাকলে মৃত ব্যক্তির আমলনামায় ‘গুনাহে জারিয়া’ বা গুনাহ যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৩. উত্তরাধিকার বণ্টনের শরয়ি নিয়ম

ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট থেকে প্রাপ্ত আয় মৃত ব্যক্তির অন্যান্য সম্পদের মতোই বণ্টিত হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসা (আয়াত ১১–১২)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী বণ্টনের প্রক্রিয়া হবে- প্রথমে কাফন-দাফনের খরচ (প্রয়োজনে), এরপর ঋণ পরিশোধ এবং বৈধ অসিয়ত (সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ) বাস্তবায়ন করতে হবে।
এরপর অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিশদের (স্ত্রী, সন্তান, পিতামাতা প্রমুখ) মধ্যে নির্ধারিত হিস্যা অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। যেমন- সন্তান থাকলে স্ত্রী পাবেন মোট আয়ের ১/৮ অংশ, সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ। অন্য ওয়ারিশরাও শরিয়াহ নির্ধারিত নিজ নিজ অংশ পাবেন।

আরও পড়ুন: মৃত্যুকে ভুলে থাকার ৭ মারাত্মক ক্ষতি

৪. পরিশ্রমের পারিশ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা

চ্যানেল বা পেজটি সচল রাখতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা ও শ্রম প্রয়োজন হয়। যদি কোনো একজন ওয়ারিশ নিজ দায়িত্বে এটি পরিচালনা করেন, তবে তিনি নিট আয় বণ্টনের আগে তার শ্রমের জন্য ‘বাজারদর’ অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবেন। এরপর অবশিষ্ট নিট মুনাফা সকল ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টিত হবে।

৫. অ্যাকাউন্টের মালিকানা ও প্ল্যাটফর্ম নীতিমালা

শরিয়তের দৃষ্টিতে মালিকানা ওয়ারিশদের হলেও প্রযুক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। মেটা (ফেসবুক) ‘লেগ্যাসি কন্ট্যাক্ট’ ফিচারের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তিকে সীমিত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। অন্যদিকে গুগল-এর ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারী জীবিত অবস্থায়ই উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে পারেন।
যদি এসব ব্যবস্থা আগে থেকে করা না থাকে, তবে আইনি প্রক্রিয়ায় (যেমন সাকসেশন সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকার সনদ প্রদর্শন করে) অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা সম্ভব। তাই বাস্তবে মালিকানা কার্যকর করতে শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন- উভয়টিই অনুসরণ করা জরুরি।

আরও পড়ুন: মৃতব্যক্তির কাজা নামাজ-রোজার ফিদিয়া আদায়ের বিধান

৬. ফিকহবিদদের দলিল

ধ্রুপদী ফিকহ গ্রন্থ ‘আদ-দুররুল মুখতার’-এ বলা হয়েছে, ‘মানুষের প্রতিটি মূল্যবান অধিকারই মিরাসের অন্তর্ভুক্ত।’ সমসাময়িক প্রখ্যাত আলেম মুফতি তাকি উসমানি তার গবেষণায় ডিজিটাল ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে ‘মাল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই অভিমত দারুল উলুম দেওবন্দসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও।

অতএব, মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল সম্পদ একটি আর্থিক সত্তা। যদি কনটেন্ট শরিয়তসম্মত হয়, তাহলে এর আয় ভোগ করা ওয়ারিশদের জন্য বৈধ এবং তা বণ্টনযোগ্য। তবে আয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মৃত ব্যক্তির আখেরাতের কল্যাণ। তাই কোনো অনৈসলামিক কনটেন্ট চালু রেখে আয় করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বরং কনটেন্ট যাচাই করে শরিয়াহসম্মতভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করাই হবে প্রকৃত সমাধান।