ধর্ম ডেস্ক
০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
আড্ডা বা পারস্পরিক কথোপকথন আমাদের সামাজিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়স্বজনের মজলিশে একত্রে বসে আমরা প্রায়ই এমন কিছু আচরণ করে ফেলি, যা আমাদের অজান্তেই অন্য কারও গভীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনই একটি অবহেলিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তিনজন থাকাকালীন একজনকে আলাদা করে রেখে অন্য দুজনের কানেকানে কথা বলা বা কানাঘুষা করা। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি সামান্য শিষ্টাচারের ঘাটতি মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি গর্হিত ও নীতিবিরুদ্ধ কাজ।
মানবজীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আচরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজকে কীভাবে সুন্দর করা যায়, তা শিখিয়েছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.)। তিনজনের উপস্থিতিতে গোপনে কথা বলার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে- আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কোথাও তোমরা তিনজনে থাকলে একজনকে বাদ দিয়ে দু’জনে কানে-কানে কথা বলবে না। এতে তার মনে দুঃখ হবে। তোমরা পরস্পর মিশে গেলে, তাতে দোষ নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৬২৯০)
ইসলাম কেবল নামাজ-রোজার আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তি ও পারস্পরিক অটুট সম্পর্ক রক্ষারও ধর্ম। তিনজনের মধ্যে দুজন যখন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করেন, তখন উপস্থিত তৃতীয় ব্যক্তির মনে নানাবিধ নেতিবাচক চিন্তার জন্ম নিতে পারে। তিনি নিজেকে অবহেলিত, তুচ্ছ কিংবা গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। এমনকি তার মনে এই সন্দেহের উদয় হতে পারে যে, তাকে নিয়েই হয়তো কোনো বিরূপ আলোচনা হচ্ছে। এই ধরনের মানসিক যাতনা এবং অবিশ্বাসের বীজ যেন সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে না পারে, সেজন্যই ইসলাম এই নির্দেশনা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: কথা বলার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলে ইসলাম
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে এই সুন্নাহর গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমানের ‘ফিসফাস’ বা ‘কানাঘুষা’ কেবল কানেকানে কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর কয়েকটি ধরন হতে পারে-
এগুলো এক প্রকারের আধুনিক ‘কানাঘুষা’, যা উপস্থিত ব্যক্তির মনে একাকীত্ব ও হীনম্মন্যতার জন্ম দিতে পারে।
আরও পড়ুন: নিজের ধ্বংসের জন্য লাগামহীন একটি কথাই যথেষ্ট
ইসলামি আইনজ্ঞদের (ফকিহ) মতে, যদি কোনো মজলিশে তিনজনের বেশি লোক উপস্থিত থাকে, দুজন নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনীয় গোপন কথা বলতে পারেন। কারণ তখন অন্তত অন্য একজন মানুষ একা হয়ে যাওয়ার বা হীনম্মন্যতায় ভোগার আশঙ্কা থাকে না। এছাড়া একান্ত প্রয়োজন হলে তৃতীয় ব্যক্তির অনুমতি নিয়ে সংক্ষেপে জরুরি কোনো কথা সেরে নেওয়া যেতে পারে।
একটি সুন্দর ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও গভীর বিশ্বাস। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে- মানুষের অনুভূতিকে সম্মান জানানোই প্রকৃত মানবিকতা এবং ইবাদতের অংশ। তিনজনের মজলিশে কাউকে বিচ্ছিন্ন না করে সবাইকে আলোচনায় সম্পৃক্ত রাখা একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই ছোট ছোট আদবগুলো মেনে চললেই আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ়, সুন্দর ও প্রশান্তিময় হয়ে উঠতে পারে।