ধর্ম ডেস্ক
০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
ইসলামি শরিয়তে বিবাহ চরিত্র রক্ষা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ইসলাম বিয়েকে একটি দায়িত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে, যেখানে মানসিক সামঞ্জস্য এবং শারীরিক-আর্থিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক বিশ্বে ‘বিয়ের বয়স’ ও ‘সাবালকত্ব’ নিয়ে ইসলামি ফিকহ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ইসলামের মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ফ্রেমে মানুষকে বন্দি করা নয়, বরং ব্যক্তির কল্যাণ ও সক্ষমতাকে নিশ্চিত করা।
পবিত্র কোরআনে বিবাহের জন্য বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা- উভয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করো, যতক্ষণ না তারা বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছায় (বালগুন নিকাহ); অতঃপর যদি তাদের মধ্যে পরিপক্বতা (রুশদ) দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও।’ (সুরা নিসা: ৬)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ (স.) যুবসমাজকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে।’ (সহিহ বুখারি)। এখানে ‘সামর্থ্য’ বা যোগ্যতা শব্দটি কেবল একটি সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি শারীরিক সক্ষমতা, আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের এক সমন্বিত পরিপক্বতা।
আরও পড়ুন: মোহরানা নিয়ে ৫ ভুল ধারণা, যা ইসলাম অনুমোদন করে না
ইসলামে বিয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে না দেওয়ার একটি বড় কারণ হলো- শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ভিন্ন হয়। ভৌগোলিক আবহাওয়া ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের শারীরিক গঠনে ভিন্নতা দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আরবের উষ্ণ আবহাওয়ায় ছেলে-মেয়েরা যে বয়সে সাবালক হয়, নাতিশীতোষ্ণ বা শীতল অঞ্চলের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন হতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, কয়েক দশক আগেও অল্প বয়সে বিয়ের বিষয়টি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং একটি সর্বজনীন সামাজিক প্রথা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় তাঁদের বিয়েও বর্তমান মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম বয়সে সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ, বিয়ের বয়স একটি আপেক্ষিক বিষয় যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়।
ফিকহ শাস্ত্রের সব ইমাম একমত যে, শারীরিক সাবালগত্ব (বুলুগ) ছাড়া বিবাহ পরবর্তী দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন বৈধ নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহে ‘খিয়ারুল বুলুগ’ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে বহাল রাখা বা বাতিলের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা সম্মতির গুরুত্বকে তুলে ধরে।
শরিয়তের ভাষায় যে বয়সে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নারীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন: রক্তশূন্যতা বা প্রসূতি মৃত্যুর ঝুঁকি), সে অবস্থায় ইসলাম কখনোই দাম্পত্য সম্পর্ক সমর্থন করে না। বরং ‘লা দারারা ওয়ালা দিরার’ (ক্ষতি করা যাবে না) নীতির আলোকে এমন সম্পর্ককে নিরুৎসাহিত ও ক্ষেত্রবিশেষে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: দারিদ্র্য নয়, আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাস: বিয়ে নিয়ে ইসলামি নির্দেশনা
বিয়ের বয়স নিয়ে কঠোর আইনি ধরাবাঁধা অনেক সময় সামাজিক অসঙ্গতি তৈরি করে। বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের অবাধ মেলামেশা বা ‘ফ্রি মিক্সিং’-এর ফলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও আইনি প্রতিকার সীমিত থাকে। অথচ পারিবারিক সম্মতিতে এবং ধর্মীয় বিধান মেনে উপযুক্ত সময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কেবল বয়সের অজুহাতে পুলিশি হস্তক্ষেপ বা সামাজিক কলঙ্ক লেপন করা অনেক সময় ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের লক্ষ্য হলো- ব্যক্তিকে চারিত্রিক সুরক্ষা দেওয়া এবং তাকে একটি বৈধ ও পবিত্র বন্ধনের সুযোগ করে দেওয়া।
আধুনিক ফিকহ একাডেমিগুলো মনে করে, রাষ্ট্র যদি জনস্বার্থে এবং মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিয়ের একটি ন্যূনতম বয়স (যেমন ১৮ বছর) নির্ধারণ করে, তবে তা শরিয়তের ‘সিয়াসা শারইয়্যাহ’ (প্রশাসনিক নীতি) অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে এই আইন এমন হওয়া উচিত নয় যা মানুষের মৌলিক অধিকার বা দ্বীনি সুরক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে। আইন ও ধর্মীয় বিধানের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে বিয়ের ন্যূনতম মানদণ্ড কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি সক্ষমতা ও পরিপক্বতার সমন্বয়। ইসলাম বাল্যবিবাহকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে না, বরং বিবাহের মাধ্যমে চরিত্র রক্ষা, সক্ষমতা এবং জনকল্যাণকে মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একটি সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে শরিয়তের বিধান ও বর্তমান সময়ের মানবিক বাস্তবতার মেলবন্ধনই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।